বিচারবহির্ভূত হত্যা পছন্দ করি না :হাইকোর্ট

হাইকোর্ট বলেছে, বরগুনার নয়ন বন্ড এক দিনে তৈরি হয়নি। কেউ না কেউ তাকে লালন-পালন করেছে। সন্ত্রাসী বানিয়েছে। বরগুনার রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারের অগ্রগতি প্রতিবেদন অবহিতের পর বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, ঐ হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্তে যদি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কারো নাম আসে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যাতে ভবিষ্যতে কোনো নয়ন বন্ড সৃষ্টি না হয়।

এরপরই পুলিশের অভিযানে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের নিহত হওয়ার বিষয়টি আদালতকে জানান তিনি। তখন হাইকোর্ট বলে, আমরা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) পছন্দ করি না। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ রিফাত হত্যা মামলার এজাহারনামীয় ও সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেফতারে অভিযানে যায়। সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের ওপর অতর্কিত গুলি করে। পুলিশও জীবন রক্ষার্থে পালটা গুলি করে। গুলির শব্দে আশপাশের এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে আসে এবং তারা একজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে। যার মরদেহ পড়ে ছিল সে-ই নয়ন বন্ড বলে এলাকাবাসী চিহ্নিত করে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। যেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয় সেখানে নয়ন বন্ডের ০০৭ গ্রুপের সদস্যরা ছিল। তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলার পাশাপাশি অস্ত্র মামলা করেছে পুলিশ। আদালত বলে, এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হয়ে অভিযান পরিচালনা করা উচিত।

গত ২৬ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীরা। ঐ কোপানোর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল। ঐ দিন হাইকোর্ট মামলার আসামিরা যেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশত্যাগ করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের আইজিকে নির্দেশ দেয়। আদালত বলে, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন যুবককে কোপাচ্ছে। ঘটনাস্থলে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে, ভিডিও করছে কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। এমনকি প্রতিবাদ করেনি। এটাই হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। আদালত বলে, দেশের পরিস্থিতি এরকম ছিল না। আগে অপরাধ সংঘটিত হলে মানুষ তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ করত। কিন্তু এখন তা না করে দাঁড়িয়ে দেখছে। পাঁচজন মানুষ যদি এগিয়ে আসত তাহলে তারা এ ঘটনা ঘটাতে সাহস পেত না। হয়ত তারা (সন্ত্রাসীরা) ক্ষমতাবান, এ কারণে মানুষ ভয়ে এগিয়ে আসেনি। সমাজটা তাহলে যাচ্ছে কোথায়? এ সামাজিক সচেতনতা তৈরি করবে কে? একইসঙ্গে ৪ জুলাই মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে জানাতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঐ নির্দেশ মোতাবেক গতকাল সকালে বরগুনার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের দেওয়া প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরে ডিএজি বাশার বলেন, মামলায় এজাহারনামীয় ১২ জন আসামি রয়েছে। এর মধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কয়েকজন সন্দেহভাজনও আটক রয়েছে। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড গ্রেফতার অভিযানে নিহত হয়েছে। আদালত বলে, কীভাবে মারা গেল? এ সময় পুলিশের অভিযানের তথ্য আদালতে তুলে ধরেন ডিএজি। তিনি বলেন, রিফাত হত্যা মামলার কোনো আসামি যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য স্থল-বিমান ও নৌ-বন্দরগুলোতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। চলছে চিরুনি অভিযান। একজন আসামিও যেন দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য তাদের পাসপোর্ট ও এনআইডির তথ্য সরকারি সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রচুরসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে কাজ করছে। যাতে কোনো আসামি পালিয়ে দেশত্যাগ করতে না পারে। এ পর্যায়ে হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলে, আসামি গ্রেফতার ও অভিযান পরিচালনা করা প্রশাসনের কাজ। আমরা এতে হস্তক্ষেপ করতে চাই না। যদি সেখানে কোনো ব্যত্যয় ঘটে তখনই বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করে থাকে।