পৃথিবীর তুল্য ভালো বিনিয়োগের জায়গা কোথাও কি আছে?

একদিকে পরমাণু যুদ্ধের চোখ রাঙানি, অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তন। পৃথিবী কি মানুষের জন্য বসবাসোপযুক্ত থাকিবে? পৃথিবী ধ্বংস হইয়া গেলে কোথায় যাইবে মানুষ? এই ধরনের অতি সাবধানি ও হতাশাবাদী ধারণা হইতে অনেকে চোখ রাখিয়াছেন চাঁদের দিকে। অনেকে মনে করেন মানুষ ক্রমশ মঙ্গলে গিয়া বসতি স্থাপন করিবে। তবে সম্প্রতি প্যারিসে জলবায়ুসংক্রান্ত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক হাত লইয়াছেন এই ধরনের অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং ইউটোপীয় ভাবনার ধনকুবেরদের। উল্লেখ থাকে যে, ইলন মাস্কের ‘স্পেসএক্স’ তাহাদের স্টারশিপ মেগা-রকেট তৃতীয় বারের জন্য পরীক্ষামূলক উেক্ষপণ করিতে যাইতেছে। এই মিশনের উদ্দেশ্য হইল—মঙ্গল গ্রহ মানুষের বসবাসের উপযোগী কি না, তাহা যাচাই করিয়া দেখা। ২০৫০ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে কয়েক লক্ষ মানুষ পাঠাইবার ব্যাপারে উচ্চাশামূলক অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছেন ইলন মাস্ক। অন্যদিকে, জেফ বেজোসের ‘ব্লু ওরিজিন’ আগামী আগস্টেই তাহাদের ‘নিউ গ্লেন’ মেগা রকেট পরীক্ষা করিতে চলিতেছে। এই পরিস্থিতিতে ওবামা বলিয়াছেন যে, মঙ্গলে জনবসতি গড়িবার স্বপ্ন না দেখিয়া পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখিবার চেষ্টা করা উচিত। পরমাণু যুদ্ধ ঘটিয়া গেলেও পৃথিবী লাল গ্রহ হইতে অনেক অধিক বাসযোগ্য থাকিবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিয়াছেন যে, যাহারা মঙ্গলে জনবসতি গড়িবার কথা ভাবিতেছেন আমি তাহাদের দিকে তাকাইয়া ভাবি, তাহারা কীসকল বলিতেছেন? ওবামা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন যদি একান্ত আটকানো না যায়, তাহা হইলেও পৃথিবীতে অক্সিজেন থাকিবে।

বাস্তবতা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন ধীশক্তিমান বারাক ওবামা যথার্থই বলিয়াছেন। কারণ মঙ্গল গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য প্রধান ও অপরিহার্য উপাদান প্রায় কোনোটাই নাই। সেইখানে নাই পৃথিবীর মতো উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল। নাই অক্সিজেন। মহাজাগতিক রশ্মি হইতে রক্ষা পাইবার জন্য সেই গ্রহে নাই চুম্বকীয় ক্ষেত্র। আর জল এবং তাপমাত্রার তফাত সুবিশাল। পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তনের পর সবচাইতে খারাপ অবস্থাও মঙ্গল গ্রহের চাইতে শতগুণ ভালো। মঙ্গলে আবাসের উপযুক্ত জায়গা তৈরি করার চাইতে সম্ভবত প্রশান্ত মহাসাগরের অতি গভীরে গিয়াও বসতি স্থাপন করা অধিক সহজ ও কম ব্যয়বহুল। সত্যিকার অর্থে আমরা এত অপূর্ব একটি গ্রহে বসবাস করিতেছি, যাহার তুলনা চলে না। মহান সৃষ্টিকর্তা কী অপূর্ব সৃষ্টি-সুষমায় এই ধরণিকে অলংকারিত করিয়াছেন! এইখানে প্রকৃতি এবং প্রাণিজগতের অপূর্ব লীলাখেলা দেখিয়া আমরা আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে শুধু এইটুকু বুঝিতে পারি—পৃথিবীর তুল্য আর কিছু নাই। সেই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘তালগাছ’ কবিতায় বলিয়াছেন—(তালগাছ) ‘মনে মনে ভাবে, বুঝি ডানা এই,/ উড়ে যেতে মানা নেই/ বাসাখানি ফেলে তার।’ তাহার পর কী হইল? তালগাছ ‘মনে মনে আকাশেতে বেড়িয়ে/ তারাদের এড়িয়ে/ যেন কোথা যাবে ও।’

এই তালগাছের মতো কিছু ধনকুবের অতি ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে লইয়া ভাবিতেছেন—পৃথিবীতে নহে, ঊর্ধ্বগগনে গড়িয়া তুলিবেন সাম্রাজ্য, নূতন উপনিবেশ। ইহা সত্য যে, আমরা এখন উষ্ণতম দিনের রেকর্ড প্রতিনিয়তই ভাঙিতেছি। বলা হয় ১ লাখ ২০ হাজার বত্সরের পুরাতন তাপমাত্রার রেকর্ড দিনের পর দিন ভাঙিয়া দিতেছি আমরা; কিন্তু ইহা মুদ্রার একটি পিঠ। অপর পিঠ বলিতেছে, পৃথিবীর অবস্থা যতই খারাপ হউক না কেন, তাহার পরও পৃথিবীর তুলনা আমাদের জ্ঞান মহাবিশ্বের আর কোথাও নাই। সুতরাং বারাক ওবামার মতো আমরাও মনে করি, এই পৃথিবীর যত্ন নেওয়ার জন্যই আমাদের বিনিয়োগ করা উচিত। জ্ঞান আহরণ এবং নূতন আবিষ্কারের জন্য মহাকাশ লইয়া গবেষণা চলিতে পারে বটে, তবে    মনুষ্যবসতি তৈরির মতো অতি ব্যয়বহুল প্রকল্প বিপুল-বিশাল অপচয় মাত্র। ‘তালগাছ’ কবিতায় তালগাছ যেমন ফ্যান্টাসির মতো চন্দ্রতারা মহাবিশ্ব ঘুরিয়া আসিবার পর অবশেষে পৃথিবীর দিকেই মন ফিরায়, আমাদের ধনকুবেরদেরও তালগাছের মতো তাহাদের মনটিকে পৃথিবীর দিকেই ফিরাইতে হইবে।