‘আস্তে কন হুজুর, হুনলে ঘোড়ায় ভি হাসব’

সম্প্রতি রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৮৭ শতাংশের অধিক ভোট পাইয়া প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পুনরায় প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হইয়াছেন। বিপুল ভোট পাইয়াই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে উপহাস করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের চাইতে রাশিয়ার গণতন্ত্র আরো বেশি স্বচ্ছ ও বৈধ। তিনি মার্কিন ভোটিং পদ্ধতি লইয়া ঠাট্টা করিয়া বলিয়াছেন, ‘(রাশিয়ার) এই ভোট যুক্তরাষ্ট্রের মেইল-ইন ভোটের মতো নহে, যেইখানে আপনি ১০ ডলার দিয়া একটি ভোট কিনিতে পারিবেন।’ পুতিন আরো বলিয়াছেন যে, (যুক্তরাষ্ট্রে) যাহা ঘটিতেছে, তাহাতে সমগ্র বিশ্ব হাসিতেছে। ইহা কেবল একটি বিপর্যয়, গণতন্ত্র নহে। পুতিন প্রশ্ন তুলিয়াছেন—যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে আক্রমণ করিবার জন্য প্রশাসন, বিচারব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিষয়ের ব্যবহার করা কি গণতান্ত্রিক? পুতিনের এই মন্তব্য মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লইয়া। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখন চারটি ফৌজদারি মামলা রহিয়াছে।

পুতিনের দিক হইতে পুতিন ভুল কিছু বলেন নাই বটে। প্রশ্ন হইল—পুতিনের মতো এত জনপ্রিয় নেতার বিরুদ্ধেও প্রায় ১৩ শতাংশ ভোট কাহারা দিল? তাহাদের এত বড় দুঃসাহস? ভোট কি একশত ভাগ পুতিনের পক্ষে পড়িলে উপযুক্ত হইত না? কিংবা একশত ভাগের অধিক! পুতিনের বিরুদ্ধে যেই প্রার্থী তিন জন ছিলেন, নিন্দুকেরা বলেন, তিন জনই নামমাত্র প্রার্থী। পুতিনের সমালোচনা করিবার কারণে অন্তত দুই জন প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। নির্বাচনের ব্যালটে পুতিন ছাড়া যেই তিন প্রার্থীর নাম রহিয়াছে, তাহাদের এক জন হইলেন নিকোলাই খারিতোনোভ। খারিতোনোভ নিজেও পুতিনকে তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন না। দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার ভ্লাদিস্লাভ দাভানকোভ আরেক জন প্রার্থী। ভ্লাদিস্লাভও পুতিনপন্থি একজন রাজনীতিক হিসাবে পরিচিত। এইভাবে পুতিনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া তিন জনই মূলত পুতিনের পক্ষেই কথা বলেন। তাহাদের সকলেই পুতিন-নিয়ন্ত্রিত। পুতিনের বিরুদ্ধে গেলে কী অবস্থা হইতে পারে, তাহার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত সম্প্রতি নিহত হওয়া বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি। তিনি ছিলেন রাশিয়ায় পুতিনের সবচাইতে বড় সমালোচক। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকিবার পর গত মাসে কারাগারে মৃত্যু হয় নাভালনির। বিশ্লেষকরা এই জন্য বলেন, পুতিনের তিন আসলে এক।

গণতন্ত্র কাহাকে বলে—তাহার নূতন সংজ্ঞা নিশ্চয়ই আমরা পুতিনদের নিকট হইতে শিখিতে পারি। পুতিনের দেশের নির্বাচনের মতো বিশ্বের অনেক দেশেই কথিত গণতন্ত্র রহিয়াছে। এই ব্যাপারে একটি গল্পের অবতারণা করা যায়। বক গিয়াছে শিয়ালের বাড়িতে দ্রুত ভক্ষণের প্রতিযোগিতায়। শিয়াল বককে দিয়াছে প্লেটে করিয়া খাইতে। বকের লম্বা ঠোঁট। সমতল প্লেট হইতে খাবার তুলিতে হিমশিম খাইতে থাকিল বক, আর মুহূর্তেই সব খাবার সাবাড় করিল শিয়াল। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না করিয়া এইভাবে যদি প্রতিযোগিতা হয়, তাহা হইলে শিয়ালরা চিরকালই একপেশেভাবে জিতিয়া যাইবে; কিন্তু লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কাহাকে বলে, তাহার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত অন্তত একটি দেশের গত ২৫০ বত্সর ধরিয়া চলমান রহিয়াছে। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা লাভের পর ২৫০ বত্সর ধরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সগৌরবে টিকিয়া রহিয়াছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, উত্থান ঘটে নাই স্বৈরশাসকের। প্রশ্ন জাগিতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন উত্থান ঘটে নাই কোনো স্বৈরশাসকের? কী রহস্য রহিয়াছে ইহার নেপথ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর যদি হয় আমেরিকান সংবিধান, তবে তাহা শতভাগ সঠিক নহে। গণতন্ত্র ফাংশনাল হইবার জন্য পরিপক্ব সংবিধান, সরকারব্যবস্থা, আইনের শাসন—এইগুলি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়ই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরো কিছু নেপথ্য শক্তি রহিয়াছে। সেইখানে রহিয়াছে বিশেষ দুইটি অলিখিত রীতিনীতি। উহার একটি হইল—পারস্পরিক সহনশীলতা। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হইল—প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা। সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা বলিতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের পর ক্ষমতাসীন কর্তৃক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করিয়া প্রতিপক্ষকে দমন না করা বুঝায়। আসলে পারস্পরিক সহনশীলতা হইতে জন্মে প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত গণতান্ত্রিক হইবে, যখন সেইখানে পারস্পরিক সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা বিদ্যমান থাকিবে। এখন সাবেক কোনো প্রেসিডেন্ট যদি মামলার শিকার হন এবং তাহার পরে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারেন—ইহার উভয় দিকই আইনের শাসনের সৌন্দর্য—যাহা যুক্তরাষ্ট্রেরই রহিয়াছে।

সুতরাং পুতিনের কথা শুনিয়া ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতো বলিতে হয়—‘আস্তে কন হুজুর, হুনলে ঘোড়ায় ভি হাসব!’