দ্বৈরথের নাম এবার ‘হেলমেট উদযাপন’

ভারত-পাকিস্তান নয়, ক্রিকেটে আরেকটি নতুন দ্বৈরথের নাম বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা। ফুটবলে যেমন দেখা যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা লিওনেল মেসি-ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ। তবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দ্বৈরথে মাঠের খেলা ছাপিয়ে প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠল উদযাপন। ব্যতিক্রমী উদযাপন ক্রীড়াজগতে আলাদা রসদ তৈরি করে সবসময়।

সারা বিশ্ব রোনালদোর বিখ্যাত উদযাপনে আনন্দ পায়। তেমনই ব্যতিক্রম উদযাপন থাকে ২২ গজে টাইগার-সিংহের লড়াইয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদযাপনও পরিবর্তন হয়ে এখন দেখা গেল ‘হেলমেট উদযাপন’। এর আগে ছিল টাইমড আউট উদযাপন, নাগিন ড্যান্স উদযাপন। মাঠে দুদলের জয়-পরাজয় ছাপিয়ে এই ভিন্ন কায়দার উদযাপন এখন সকলেরই নজর কাড়ে। গতকাল চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সিরিজের শেষ ও তৃতীয় ওয়ানডেতে ৫৮ বল হাতে রেখে ৪ উইকেটে জয় পায় বাংলাদেশ। তাতে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ জিতে বিগত হারের প্রতিশোধ নেয় লাল-সবুজের দল। সিলেটের মাটিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে টাইমড আউট উদযাপন করে বাংলাদেশের যে ক্ষত তৈরি করেছিল শ্রীলঙ্কা, সেই ক্ষতের জবাব দেওয়া হয়েছে হেলমেট উদযাপন করে।

২০১৮ সালে নিদাহাস কাপে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে নাগিন ড্যান্স করেছিল পুরো বাংলাদেশ দল। নাজমুল হোসেন অপুর করা সেই নাগিন ড্যান্স দিয়ে মুশফিকুর রহিম বাজিমাত করেছিলেন। শ্রীলঙ্কাও সেই উদযাপন রপ্ত করেছিল বাংলাদেশকে খোঁচা দেওয়ার জন্য। নাগিন ড্যান্সের উদযাপন দেখে বিভিন্ন দেশের আরো অনেক ক্রিকেটার অনুপ্রাণিত হয়ে মাঠে সেটির প্রয়োগ করেছিলেন সে সময়ে। এখন সেটি কেবলই অতীত। ভারত বিশ্বকাপ থেকে দুদলের উদযাপনে দেখা যায় টাইমড আউটের প্রভাব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম বারের মতো টাইমড আউট হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। বিশ্বকাপের সেই ম্যাচেই তিনি সাকিব আল হাসানকে আউট করে হাতের ঘড়ি দেখিয়ে উদযাপন করেছিলেন। পরে সেটি টাইমড আউট উদযাপন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

এরপরে ঘরের মাটিতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টি-টোয়েন্টি সিরিজের শুরুতেই ম্যাথিউসের সেই টাইমড আউট উদযাপন ফিরিয়ে এনেছিলেন শরিফুল ইসলাম। এরপরে লঙ্কানরাও একই উদযাপনে নেমে পড়েন। লাক্কাতুরায় টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতে ম্যাথিউস-হাসারাঙ্গারা মিলে হাত দেখিয়ে টাইমড আউটের উদযাপন করেছিলেন। অপেক্ষা ছিল, সেটির জবাব দেওয়ার। এই অপেক্ষার ফল বাংলাদেশের পক্ষেই এসেছে। ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে সকলের চোখমুখে হয়তো একটাই প্রশ্ন ছিল, লঙ্কানদের উদযাপনের জবাব কীভাবে দেবেন টাইগাররা।

 

টাইগারদের জবাব দেওয়ার মূলনায়ক বরাবরের মতো এবারও মুশফিকুর রহিম। সিরিজ জয়ের শিরোপা নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তরা যখন উল্লাসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন হুট করে একটা হেলমেট নিয়ে হাজির হলেন মুশফিক। শরিফুল-মিরাজদের বলে দিচ্ছিলেন কোথায় কাকে দাঁড়াতে হবে। অন্যদিকে মুশফিকের হাতে হেলমেট দেখে মুচকি-মুচকি হাসছিলেন কোচ চান্ডিকা হাথুরুসিংহে। প্রথমে সতীর্থ কিংবা দর্শকরা হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি, কী হতে চলেছে! কিন্তু মিস্টার ডিপেন্ডেবলের অঙ্গভঙ্গিতে সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল মুহূর্তেই। হেলমেট ধরে এদিক-ওদিক জিজ্ঞাসু নয়নে তাকাচ্ছিলেন। আর সতীর্থরা সেটিতে হাসি চেপে রাখতে পারছিলেন না। তাসকিন তো রীতিমতো মজা পেয়ে মাথা গুজে দিলেন মিরাজ ও জুনিয়র তামিমের কাঁধে। আর আম্পায়ার হিসেবে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন পেসার শরিফুল। সবমিলিয়ে মানসপটে আবারও ভেসে উঠল ভারত বিশ্বকাপের টাইমড আউটের ঘটনা। যেখানে ম্যাথিউস যেন বারবার আম্পায়ার মারাইস ইরাসমাসকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, মাঠে নামতে দেরি হওয়ার কারণ ছিল, হেলমেটের ফিতা ছিঁড়া ছিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। কারণ টাইমড আউট। উপায় না পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ম্যাথিউসকে এবং বের হয়ে রাগে-ক্ষোভে হেলমেট ছুড়ে মারলেন মাঠের পাশে। গতকাল চট্টগ্রামে মুশফিকের উদযাপনে সেই ঘটনাটিও ছিল। তাতে এই দ্বৈরথের নতুন মাত্রা যোগ হলো। এখন থেকে নাম হলো হেলমেট উদযাপন।

ম্যাচ শেষে নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘আমরা উদযাপন করেছি। আমাদের মন মতো উদযাপন, যেটা মনে আসছে তেমনি করেছি এবং সিরিজ জেতার পর উদযাপন হবে এটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে মুশফিক ভাই তিনটা ম্যাচে যেরকম ভূমিকা পালন করেছেন এবং আজকের ইনিংসটা সেরা ইনিংসগুলোর মধ্যে একটা আমার মনে হয়। তাতে উদযাপন হওয়াটাই স্বাভাবিক।’এর আগেও এমন ব্যতিক্রমী উদযাপন কিংবা খেলার বাইরের উত্তেজনায় বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার লড়াইয়ে দেখা গেছে। ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম বারের মতো ওয়ানডে জিতেছিল বাংলাদেশ। কুমার সাঙ্গাকারা-মাহেলা জয়াবর্ধনদের বিপক্ষের সেই সিরিজেও দুদলকে আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। তবে সে সময়ে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকায় বিষয়গুলো এত ভাইরাল টপিকে পরিণত হতো না। এ দিকে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার উদযাপনের এমন দ্বৈরথকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন সকলে।