রাজধানীর কারওয়ান বাজার হইতে কাঁচাবাজার ও আড়ত অন্যত্র সরাইয়া ফেলিবার বন্দোবস্ত হইয়াছে। ৪০০ বত্সরের পুরাতন এই ঢাকা শহরের অন্যতম প্রাচীন বিপণিকেন্দ্র কারওয়ান বাজার। এই বাজারের ইতিহাসও কয়েকশত বত্সরের পুরাতন। ইতিহাস বলিতেছে, শূরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতবর্ষের সম্রাট শেরশাহ শূর (১৫৩৮-১৫৪৫) সুলতানি বাঙলার রাজধানী সোনারগাঁ হইতে পাঞ্জাবের মুলতান পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘সড়ক-ই-আযম’ বা ‘গ্র্যান্ড ট্রাক রোড’ নির্মাণ করেন। তিনিই প্রথম ঘোড়ার ডাকের ব্যবস্থা করেন এবং এইজন্য দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান, পথচারীদের নিরাপত্তা, রাত্রিযাপন, সংবাদবাহকের ঘোড়া বদল ইত্যাদি কারণে এই সড়কে নির্দিষ্ট দূরত্বে তাহার প্রশাসন নিরাপত্তাচৌকি ও সরাইখানা স্থাপন করে। সড়ক-ই-আযম কারওয়ান বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এইখানে ছিল একটি সরাইখানা। ফারসি শব্দ ‘ক্যারাভাঁ’ অর্থ সরাইখানা। অনেকের মতে, ‘ক্যারাভাঁ’ হইতে ক্যারভান বাজার, অতঃপর কালের পরিক্রমায় কারওয়ান বাজার নামকরণ হয় এই স্থানটির। অন্যদিকে ব্রিটিশ আমলে জেমস রেনেলের তথ্যানুযায়ী তেজগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী নড়াই নদী আর বর্তমানে যেই রাস্তাটি পান্থপথ নামে পরিচিত, তাহাই ছিল একসময়ের পান্ডু নদী। পান্ডু নদীর শাখা নদী ছিল কারওয়ান নদী। এই নদী দিয়া স্থলপথের পাশাপাশি নৌপথেও শহরের ভেতর যাতায়াতের সুবিধা ছিল। শায়েস্তা খানের তৈরি করা সরাইখানার কারণেই পান্ডু ও কারওয়ান নদীর তীর ঘেঁষিয়া এই স্থানে একটি বাজার বসে। অনেকের মতে, ফারসি ভাষায় মুসাফির অর্থে ব্যবহূত হয় ‘কারওয়া’, সেইজন্য বাজারটির নাম হয় কারওয়ান বাজার।
ইহা ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল এবং দূষিত শহর। এই শহরকে কীভাবে আরো সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করা যায়, সেই পরিকল্পনা হইতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং পরিকল্পনা করিয়াছেন কারওয়ান বাজারকে স্মার্ট হিসাবে গড়িয়া তুলিবার, নূতন করিয়া ঢালিয়া সাজাইবার। এইজন্য পরিকল্পনা করা হইয়াছে কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার ও আড়ত গাবতলীতে স্থানান্তরের। গাবতলীতে কাঁচাবাজারটি পরকল্পিতভাবে সকল কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করিয়া নির্মাণ করা হইয়াছে। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হইয়াছে। অন্যদিকে কারওয়ান বাজার এখন ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। সুতরাং একটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে পাইকারি কাঁচাবাজার থাকিবার অবকাশ কম। কারণ, কারওয়ান বাজারে ট্রাক আসা-যাওয়ার ফলে রাস্তা বন্ধ করিয়া মালামাল নামানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই নিয়মশৃঙ্খলারও ব্যত্যয় ঘটে। সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। কেবল তাহাই নহে, কারওয়ান বাজারটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কোনো নিরাপত্তা নাই। অন্যদিকে মহাসড়কের পাশাপাশি নদীপথেও মালামাল পরিবহন করা যাইবে গাবতলীর আমিনবাজারের কাঁচাবাজারে। সেইখানে বাজারের পাশ দিয়াই আট লেনের সড়ক নির্মাণ করা হইতেছে। সংশ্লিষ্ট সিটি মেয়র এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের যেই দৃঢ়তা দেখাইতেছেন, তাহার জন্য সাধুবাদ জানাইতেই হয়। ইতিপূর্বে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলিয়াছেন, ‘কারওয়ান বাজারের সব রাস্তা আপনারা দখল করে আছেন। কারওয়ান বাজারের পার্ক, মাঠ দখল করে বাজার বসিয়েছেন। তাই সবার এই অপশনটা (আমিনবাজারের স্থানান্তর) নেওয়া দরকার। কারওয়ান বাজারের মত্স্য বাজার, পাইকারি বাজার সব ধীরে ধীরে সরে যাবে। কারওয়ান বাজার আপনাদের ছাড়তে হবে। এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত।’
মনে রাখিতে হইবে, যোগাযোগব্যবস্থায় রাজধানীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। বাংলাদেশ ক্রমশ স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হইতেছে। ইতিমধ্যে গতকাল বুধবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারওয়ান বাজার অংশের র্যাম্প যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করা হইয়াছে। বিমানবন্দর, বনানীসহ বিভিন্ন পয়েন্ট হইতে উঠিয়া এই র্যাম্প দিয়া চলাচল করা যাইবে কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, মগবাজার, মিন্টো রোডসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়। সুতরাং সুষ্ঠু-সচল ঢাকার জন্য ইহার কেন্দ্রতে থাকা কারওয়ান বাজার পরিবর্তন করাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইহাই বাস্তবতা। কারণ পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশের রাজধানীর মাঝখানে এমন পচনশীল পণ্যের পাইকারি কাঁচাবাজার থাকিতে পারে না। তাহা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এই মার্কেট কেবল ব্যবসায়ীদের জন্যই নহে, যাহারা ক্রেতা তাহাদের জন্যও বিপজ্জনক। পুনর্বাসনের জন্য ব্যবসায়ীরা যত তাড়াতাড়ি এই সত্য ও বাস্তবতা অনুধাবন করিবেন, ততই মঙ্গল।