আমরা একই অভিমানের পথিক

আমি যে কোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনে সবসময় বলেছি যে খালিদ আমার প্রিয় শিল্পী। একজন শিল্পীর আরেক কলিগকে তখনই প্রিয় মনে হয়, যখন সেখানে স্বার্থহীন ভালবাসা আর শ্রদ্ধা জেগে থাকে। আজকাল তো সবই স্বার্থের দামে বেচাকেনা হয়। খালিদ ছিল অরগানিক ভালোবাসার যুগের মানুষ। তাই খালিদের মৃত্যুর পরপরই মনটা বিষাদে ভরে যায়। আমি তানভীরকে ফোন দিই। কারণ ওর এক লাইভ অনুষ্ঠানেই আমি বলেছিলাম খালিদ আমার এদেশে প্রিয় শিল্পীর একজন ।

সেই আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে পরিচয় । সারগাম স্টুডিওতে প্রায় সময়ই আমার রেকর্ডিং-এর পরে ওদের শিফট থাকতো। চুপচাপ বসে থাকতো। আমরা হয়ত খানিক বেশি সময় নিয়ে নিতাম। কিন্তু চোখে মুখে ওর স্বভাব বিনয়টা বুঝতে পারতাম। কিছু বলতো না। কোনো সিনিয়রকে সে অসম্মান করে কথা বলেছে এমন নজির নেই।

বিরহী প্রধান গানগুলো দারুণ শোনাতো খালিদের গলায়। খালিদ কিন্তু সাবলীল ভঙ্গিতে স্টেজ বা রেকর্ডিং এ গাইত। ও আমার দেখা অদ্ভুত এক রকস্টার। যার ভেতরে বাড়তি কোনো আড়ম্বড় নাই। একদম সাবলীল। স্টেজে কোনো লোক দোখানো লাফালাফি নাই বা শো-অফ যাকে বলি। তা ওর ভেতরে ছিল না। একদম জেনুইন আর্টিস্ট। অথচ স্টাইলে সেরা। ওর মতো আধুনিক বাইক রাইডার এদেশে কিন্তু কেউ ছিল না।

আরেকটি সত্তাকে নিয়ে আমরা আলোচনা করি না । তা হলো খালিদ সে সময়ের স্বৈরাচার আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিল। একজন প্রকৃত রকস্টারদের ভেতরেই এ ধরনের আত্মার বসবাস থাকে।

ব্যক্তিজীবনে অনেকেই অনেকরকম বাউন্ডুলেপনা থাকে বা থাকতে হয়। সেটা ভিন্ন বিষয়।

আজ এই স্মৃতিনোটে আমি বলবো— খালিদের মৃত্যু আমাদের বেশ কিছু চিন্তার জায়গা তৈরি করে। তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য। এখানে আর্থিক সঙ্গতি অনেক বড় বিষয়। যদি বলি ... এদেশে রয়ালিটি বা গানের যোগ্য পারিশ্রমিক পাবার ন্যুনতম একটা প্রথা থাকলে ... কী অসুস্থ শরীর নিয়ে এত এত শো করতে হতো আইয়ুব বাচ্চুকে ?

খালিদের যতগুলো জনপ্রিয় গান রয়েছে ... বা আমার কিংবা কুমার বিশ্বজিতের যতগুলো জনপ্রিয় গান রয়েছে। অনেক শিল্পীর ক্যারিয়ারে এত গান নেই। তো এই সমৃদ্ধির জায়গার কী কোনো আর্থিক মূল্যায়ন আছে ? পদক বা সম্মাননা ওসবের কথা বলছি না । খালিদও এসবের কোনো প্রত্যাশা রেখে গান করেনি। আর আমি তো বলেই দিয়েছি ... কোনো পদক যেন না দেয়! এই যে শিল্পী সম্মানের অবমূল্যায়নে কিন্তু একজন খালিদ তার শরীরের যত্ন নেয় না। অস্থিরতাও পেয়ে বসে।

আমি তো মনে করি ... খালিদের মতো এত বড় মাপের শিল্পীর হয়ে ওঠার পেছনে ওর স্ত্রী কবি শামীমা জামানের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। ছেলে আরিককে যেভাবে বড় করেছে। একইভাবে বলবো— এই যে খালিদের পরিবার বা আমরা অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে আসি। এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা উচ্চপদস্থদের কি ভাববার অবকাশ নেন ? সকলেরই ভাববার বিষয় রয়েছে। নয়ত একা খালিদ যখন সন্তান বা পরিবারবিহীন চলে আসলো... তখন কী সে নিজের শরীরের যত্ন নিতে পেরেছে। এসব বিষয় সুক্ষ্ম হলে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

আজ খালিদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক কথাই ভাবতে হচ্ছে। আশির দশক থেকে আমরা বা এরপর থেকে খালিদরা একরকম ইংরেজি আর হিন্দি প্লে লিস্ট থেকে বাংলা গানের অভ্যেস করিয়েছিলাম। বাঙালিদের ভেতরে এই কালচার প্রবেশের অন্যতম কারিগর কিন্তু বাংলার রকস্টাররা। আমাদের পরে আর গান কই ? এখন অনেকেই ব্যান্ড করছেন বা চালাচ্ছেন? তাদের ব্যান্ড আর্টিস্ট না বলে কাভার আর্টিস্ট বলা ভাল। খালিদ’রা স্টেজে নিজেদের গান নিয়ে মাতিয়েছেন একটা জীবন। সর্বশেষ আমেরিকায় যখন ওর সাথে দেখা হলো... অনেক্ষণ কথা হলো দুজনার। দুজনার নানান প্রসঙ্গের আলাপের ভেতরে মিল পেলাম দুজনার অভিমানের। আমরা আসলে অনেকটা একই অভিমানের পথিক। খালিদ, ভাল থাকিস ভাই আমার। তোকে যে অনেক ভালোবাসি... তা সামনাসামনি আর বলার সুযোগ পাবো না ।

লেখক: দেশবরেন্য কণ্ঠশিল্পী