একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে পরাশক্তিগুলির মধ্যে সংঘাত-হানহানি লাগিয়াই রহিয়াছে। ভূরাজনৈতিক বা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে এই সংঘাতের বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে উঠিয়া আসে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সংগঠন। পরাশক্তিগুলিকে এই সকল সংগঠন তেমন কিছু করিতে পারে না বটে, তবে তাহাদের দ্বারা মাঝেমধ্যে এমন সকল কর্মকাণ্ড সংঘটিত হইতে দেখা যায়, যাহা হতবিহ্বল করে সবাইকে। উত্তপ্ত কেতলি বা প্রেশার কুকারের ভিতর হইতে গরম বাষ্প বাহির হইতে না পারিলে যেমন উহা হইতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, তেমনিভাবে পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব-পরিস্থিতির ফলে বাষ্পের মতো বিস্ফোরিত হয় এই সকল গোষ্ঠী। রাশিয়ায় যে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার দায় স্বীকার করিয়াছে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস-কে। এই গোষ্ঠীটি রাশিয়াকে বহুদিন ধরিয়াই শাসাইয়া আসিতেছিল। যদিও রাশিয়া উহাকে আমলে নেয় নাই। তবে শেষ পর্যন্ত কেতলির বিস্ফোরণ ঘটিয়া গরম বাষ্প পুড়াইয়া দিল মস্কোবাসীকে!
রাশিয়ায় মার্কিন দূতাবাস ৭ মার্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করিয়া জানাইয়াছিল যে, মস্কোয় বৃহত্ জমায়েতে উগ্রপন্থিদের হামলার পরিকল্পনা রহিয়াছে। সতর্কবার্তায় স্পষ্ট করিয়া বলা হয়, কনসার্টে হামলার ঘটনা ঘটিতে পারে। এইরূপ অবস্থায় মস্কোয় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের ৪৮ ঘণ্টার জন্য বৃহত্ জমায়েত এড়াইয়া চলিবার পরামর্শও দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের সতর্কসংকেত স্বভাবতই মার্কিন নাগরিকরা আমলে নিলেও উহা কেয়ার করে নাই ক্রেমলিন, যাহার ফলাফল হাতেনাতে পাইতে হইল রুশ নাগরিকদের।
দার্শনিক থমাস একুইনাসের একটি উক্তি আজও অনেক প্রাসঙ্গিক। তিনি বলিয়াছেন, ‘যার মধ্যে বিশ্বাস আছে, তার কাছে ব্যাখ্যা করিবার প্রয়োজন পড়ে না; আর যাহার ভিতরে তাহা নাই, তাহার কাছে ব্যাখ্যা মূল্যহীন।’ ওয়াশিংটনের আশঙ্কা অনুযায়ী সত্যি সত্যিই হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করিল মস্কো! রাশিয়া প্লাবিত হইল রক্তস্রোতে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানী মস্কোর ক্রোকাস সিটি কনসার্ট হলের ভয়াবহ হামলার ঘটনায় এই লেখা পর্যন্ত বন্দুকধারীদের হামলায় ১১৫ জনের বেশি নিহত এবং অনেকে আহত হইয়াছেন। কনসার্ট উপভোগ করিতে যাওয়া লোকজনের ওপর এহেন আকস্মিক হামলায় স্বাভাবিকভাবেই হতবিহ্বল রাশিয়াসহ গোটা বিশ্ব।
রাশিয়ার এই ধরনের হামলার শিকার হওয়ার নজির এইবারই প্রথম নহে। ইহার পূর্বে একাধিকবার পাতালরেল, কনসার্ট হল, অডিটরিয়াম, মল প্রভৃতি স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের হামলায় বহু রুশ নাগরিক হতাহত হইয়াছেন। তবে এইবারের ঘটনা বেশ বিব্রতকর হইয়া উঠিবে সদ্য পুনরায় ক্ষমতায় আসা ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য। কারণ, তিনি রাশিয়াকে জটিল এক যুদ্ধে জড়াইয়া ফেলিয়াছেন। দেশের অভ্যন্তরেও নানাবিধ অস্থিরতা দানা বাঁধিতেছে। ঠিক এমন একটা মুহূর্তে গোয়েন্দা নিরাপত্তার চোখ ফাঁকি দিয়া বৃহত্ রক্তারক্তির ঘটনায় সমালোচনা স্বাভাবিক।
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করিতেছেন, গাজা যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হইতে যেই প্রস্তাব উঠিয়াছিল জাতিসংঘে, তাহাতে রাশিয়ার ভেটো দেওয়ার কারণেই সুন্নিপন্থি আইএস-কে এই হামলার ঘটনা ঘটাইয়াছে। যদিও এই বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করিয়া কিছু শোনা যায় নাই। তবে এই ধরনের সংগঠনগুলি যে পরাশক্তিগুলির মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে, তাহা আবারও প্রমাণিত হইল। সশস্ত্র সংগঠনগুলি হঠাত্ করিয়াই যে ফুঁসিয়া উঠিল, তেমন নহে। বরং বিভিন্ন ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাত তাহাদের কেতলির পানির ন্যায় উত্তপ্ত করিয়া তুলিয়াছে বলিতে হইবে। আমরা যদি ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা গাজা সংঘাতের কথা বলি, এই সকল অঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাইতে লক্ষ করিব। এই সকল স্থানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত প্রেশার কুকারের ন্যায় হইয়া উঠিয়াছে। যেইখানে বিস্ফোরণ অনিবার্য! হানাহানি-অস্থিতিশীলতার মাধ্যমে পরাশক্তিগুলি যদি বিভিন্ন অঞ্চলকে উত্তপ্ত করিয়া তোলে, সুস্থ পরিবেশের বাতাসকে বুলেট-বোমার আঘাতে ভারী করিয়া তোলে, তাহা হইলে সেইখানে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো কঠিন। এই ক্ষেত্রে বলিতে হয়, বৃহত্ শক্তিকে বৃহত্ ভাবনা লইয়াই চলিতে হইবে। অন্যথায় হামলার ন্যায় সতর্কসংকেত উপেক্ষা করিবার মাশুলই অবধারিত হইয়া উঠিবে!