এই দুঃসাহসের শেষ কোথায়?

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই মোবাইল অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণফোন ও রবির নিকট বাংলাদেশ সরকারের ১৩ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা পাওনা রহিয়াছে। ইহার মধ্যে এককভাবে গ্রামীণফোনের নিকটই পাওনা ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা। আর রবির নিকট পাওনা ৮৬৭ কোটি টাকা। গ্রামীণফোনের পাওনার মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) পাইবে ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ১ লক্ষ টাকা। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর পাইবে ৪ হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লক্ষ টাকা। এই টাকা উদ্ধারে বহুদিন ধরিয়া তাগাদা দেওয়া হইতেছে। কিন্তু গ্রামীণফোন ও রবি ইহাতে কোনো গ্রাহ্যই করিতেছে না। প্রশ্ন উঠিয়াছে, এই টাকা পরিশোধে টালবাহানা করিবার দুঃসাহস তাহারা কোথা হইতে পাইতেছে? আমাদের দেশে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী প্রায়শ ঋণখেলাপিদের বিদেশে অর্থপাচারের কথা বলিয়া থাকেন। ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীরা দেশ ও জনগণের দুশমন ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই, যদিও সব ঋণখেলাপিকে একই কাতারে ফেলা যায় না। কিন্তু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো যখন বকেয়া পাওনা দিতে গড়িমসি করে এবং অবৈধভাবে অর্থ পাচার করে, তখন সেই শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা মুখে কুলুপ লাগাইয়া থাকেন কেন?

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এইজন্য ঋণখেলাপিদের ফাঁসি দাবি করিতেছেন অনেকে। যদিও ‘ইচ্ছা করিয়া’ খেলাপি হইয়াছেন, এমন ক্ষমার অযোগ্য ঋণগ্রহীতার সংখ্যা নগণ্য। অধিকাংশ ঋণগ্রহীতাই পরিস্থিতির শিকার। তাহারা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুত্-গ্যাসসহ নায্য নানা সুবিধা না পাওয়ায় তাহাদের নাম অনেক সময় উঠিয়া আসে ঋণখেলাপির তালিকায়। কিন্তু যাহারা এইরকম কোনো অসুবিধায় পড়েন নাই, তাহাদের বকেয়া অর্থ কেন অপরিশোধিত থাকিবে দিনের পর দিন? বিদেশিরা যদি আমাদের জিম্মি করিয়া পাওনা অর্থ আদায় না করিবার দুঃসাহস দেখাইতে পারে, তাহা হইলে দেশি ঋণখেলাপিরাও তো একই পথ অনুসরণ করিতে পারে! আমাদের দেশে একশ্রেণির মতলববাজ এই অন্যায় ও অনিয়ম দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিতেছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল দেশে অনেক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিকে শেষ পর্যন্ত অপমানিত ও অপদস্থ হইয়া পাততাড়ি গুটাইতে হইয়াছে। তাহাদের অন্যায় ও অবিচারের জন্য খুনখারাবির ঘটনাও ঘটিয়াছে। দেশে এইসব কোম্পানির চেয়ারম্যান কাহারা হন তাহা আমাদের অজানা নহে। কোনো রাজনীতিবিদ নহে, অর্থ বিভাগের একশ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব পদ অলংকৃত করিয়া থাকেন। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির বহুরূপী আচরণ দেখিয়াও তথাকথিত সুশীল সমাজের চুপ থাকিবার কারণটি বুঝিতে আমাদের অসুবিধা হইবার কথা নহে।

এই অনিয়ম যাহাদের দেখিবার কথা ছিল, তাহারা তাহাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন নাই। তবে এইখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করিতেই হয়। এই ব্যাপারে তাহার ক্ষোভ প্রকাশের পরই আজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নড়িয়া চড়িয়া বসিয়াছে। গ্রামীণফোন ও রবি যেই পর্যন্ত টাকা না দিবে, সেই পর্যন্ত চাপপ্রয়োগ অব্যাহত রাখিতে হইবে। এমনকি টাকা না দিয়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা যাহাতে বাংলাদেশ ত্যাগ করিতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও গ্রহণ করিতে হইবে।