আলোকপাত
অজয় দাশগুপ্ত
কোথাও কিছু মারাত্মক ধরনের ভুল হচ্ছে। তা না হলে আমাদের যে সমাজ বা দেশ, তাতে এমন সব ঘটনা নিয়মিত হয়ে যাবার কথা ছিল না। কী কী নিয়মমাফিক হচ্ছে? হত্যা, ধর্ষণ, অরাজকতার পাশাপাশি এখন আমরা দেখছি গুরু-শিষ্যের যে মধুর সম্পর্ক, সেটাও পড়েছে তোপের মুখে। আমরা সে দেশের মানুষ, যে দেশে আমেরিকান কায়দায় টিচারকে নাম ধরে ডাকা হয় না। ভিক্টোরিয়া যুগের আদলে স্যার ম্যাম ডাকি আমরা। তার আগেও যখন টোল ছিল, তখন আমাদের টিচারেরা ছিলেন গুরু। এই গুরু কিন্তু পিতার চেয়েও বড়ো।
যারা আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতেন তাঁদের আমরা কখনো পায়ে ধরা ছাড়া প্রণাম বা সালাম করিনি। মনে আছে আমাদের হাই স্কুলের একজন শিক্ষক মাঝে মাঝে ছাত্রদের বাড়িতে যেতে চাইতেন, যাদের বাড়ি কাছে সেখানে গিয়ে রেডিওতে ক্রিকেট ভাষ্য শুনবেন বলে। তখন আকাশবাণী বা বাংলাদেশ বেতার ছাড়া আর কোনো বাহন ছিল না।
এই শিক্ষককে নিয়ে যাবার প্রতিযোগিতা ছিল দেখার মতো। শুধু কি তা-ই? তিনি যাবেন বলে আমাদের মায়েরাও কত আদর-যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করতেন। ইংরেজির এই শিক্ষককে আমরা ভয় পেলেও পিতার চেয়ে বেশি সম্মান করতাম। তিনি আমাদের মায়েদের ডাকতেন মা জননী বলে। এমন দেশে এমন সমাজে স্বাধীন বাঙালির সে সম্পর্ক এখন সুতোর ওপর ঝুলছে।
অভিযোগগুলো কিন্তু গুরুতর। বিশেষত সবকিছু ছাপিয়ে সন্দেহ আর অভিযোগের কারণ শরীর। মাতা, ভগ্নি, কন্যা কাউকে ছাড় না দেওয়ার এই প্রবণতা কেন এমনভাবে নেগেটিভ প্রভাব বিস্তার করল? বিশেষত শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ে এ ধরনের অভিযোগ পাপ বা গুনাহ মানার পরও সমাজে আজ এর ছড়াছড়ি। ছাত্রীরা বলছে তারা আতঙ্কিত। তাদের ভাষায় কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে ভালো মার্কস মেলে না। কেউ বলছেন শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ না হলে আরাধ্য ফলাফল অসম্ভব। অন্যদিকে ছাত্রদের বেলায় দেখছি উত্তেজনা আর হাত তোলার প্রবণতা। এখন তো এমন এক সময় এসে গেছে, যাতে কেউ কারো কাছে নিরাপদ নয়। এখন এগুলো এড়িয়ে বা চোখ বুজে থাকার সময় নাই। সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়টি কিন্তু ক্রমেই হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ঘরে ঘরে সম্পর্ক নষ্ট আর পরিবারে বন্ধন শিথিল হবার এ আরেক মস্ত কারণ। কাজেই ছাত্রছাত্রীদের যেমন একতরফা দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে না, তেমনি শিক্ষকরাও এখন আর ধোয়া তুলসী পাতা নয়। এটাই এ সময়ের বড়ো জিজ্ঞাসা—কবে কখন কীভাবে এমন বৈরী বাতাস আমাদের সমাজে ঢুকল? আর যা এখন ঠেকানোও প্রায় দুঃসাধ্য। তাই এখানে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষ—এই তিনের সমন্বয় দরকার।
কোনটা আমরা চাই? আপদ বিপদ ঘাড়ে নিয়ে বড়োলোক হতে, না শান্তি নিয়ে সামনে এগোতে? এর উত্তর যাঁরা দিতে পারবেন তাদের কাছে আছে বড়ো সমাধান। আর ছোট সমাধানগুলো পরিবারে। পরিবারে নিয়ম শৃঙ্খলা ও আনন্দ ফিরলে সমাজেও তা ফিরে আসতে বাধ্য।
লেখক :সিডনি প্রবাসী প্রাবন্ধিক