শুভ্র ঘোষ
দেশে চিনিশিল্প নিয়ে সংকট দীর্ঘদিনের। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ আজো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এ শিল্পে একদিকে চাষিদের আখ বিক্রির টাকা বকেয়া পড়ে থাকে দিনের পর দিন, অন্যদিকে চিনির মজুদ পড়ে থাকে মিলগুলোর গোডাউনে, সেইসঙ্গে বকেয়া থাকে কর্মীদের বেতন—এ যেন দীর্ঘকালের চেনা চিত্র। এ সংকটের কারণে চাষিরা যেমন অর্থকষ্টে ভোগেন তেমনই চিনিকলের কর্মীরাও বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। এ শিল্পের সংকট দূর হবে কবে—সেই প্রশ্নেই ঘুরপাক খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, ‘আখচাষিদের পাওনা রয়েছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বাকি ৬ কোটি টাকা।’ সংবাদটি খুবই উদ্বেগের। একটা কৃষিমুখী শিল্পের কাঁচামাল উত্পাদনকারীদের সরবরাহ করা পণ্যের দামই যদি মিল কর্তৃপক্ষের কাছে দিনের পর দিন আটকে থাকে, তাহলে এর প্রভাব তৃণমূলের ঐ চাষিদের মাঝে পড়বেই। তাছাড়া যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে কৃষকরা কাঁচামাল উত্পাদন করেন, সে পণ্যের দামই যদি আটকে যায়, তাহলে তারা জীবনযাপনের খরচ চালাবেন কোথা থেকে আর পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের জন্য প্রস্তুতি নেবেনই বা কিভাবে?
সংবাদ ভাষ্যমতে, সরবরাহ করা আখের মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে আখ চাষ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন চাষিরা। এসব কারণে বর্তমানে চিনিকলের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। এর নেপথ্যের আরেক কারণ হচ্ছে চিনি বিক্রি না হওয়া। কেবল রংপুর চিনিকলের গুদামে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে চার হাজার মেট্রিক টন চিনি। আর বিএসএফআইসির অন্য চিনি কলগুলোর গুদামে মজুদ আছে ৩৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৭০ হাজার মেট্রিক টন চিনি। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে মজুদ আছে সংস্থার আমদানি করা ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ মেট্রিক টন চিনি। সেই চিনি আবার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৫ টাকা কমে ৪৫০ কোটি টাকায় বিক্রি করে রংপুর চিনিকলসহ সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন চাষিদের বকেয়া বাবদ সরবরাহ করা হয়েছে।
দেশের চিনিকলগুলোর গুদামে অবিক্রীত চিনি থাকার পরও আমদানির কথা শোনা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে দেশে উত্পাদিত চিনিই অবিক্রীত থাকে সেখানে আমদানি করার প্রশ্নটি আসে কেন তা বোধগম্য নয়। তাহলে কি আমদানি করা চিনি সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে লাভজনক? তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের দেশের চিনির উত্পাদন খরচ কি বেশি? নাকি চাহিদার তুলনায় উত্পাদন কম? উত্পাদন যদি কমই হবে তাহলে মিলগুলোর আমাদের দেশের চিনিকলগুলোর ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ অনেক পুরনো। বিশেষ করে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মৌসুমি শ্রমিক নিয়োগে অনেক দুর্নীতি হয়—এমন অভিযোগ বরাবরই শোনা যায়। তাই যদি হয়, তাহলে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে একটা শিল্প বছরের পর বছর অলাভজনক পথে চলতে থাকবে আর এর যাবতীয় দায় সরকার বহন করেই যাবে—এটা হতে পারে না। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।
খাদ্য তালিকায় চিনি প্রয়োজনীয় উপাদান। নিত্যপণ্যগুলোর মধ্যে দৈনন্দিন তালিকায় চলে আসে চিনি। এই পণ্যটির উত্পাদনে দিনের পর দিন অনিয়ম চলতে পারে না। যেহেতু সরকারি সংস্থার অধীনে এই পণ্যের উত্পাদন প্রক্রিয়া সেহেতু অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করা সরকারেরই দায়িত্ব। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহায়তায় এ খাতের যাবতীয় অনিয়ম দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যাবতীয় অনিয়ম দূর করতে সরকার এ বৃহত্ শিল্প খাতটির দিকে সুনজর দেবে—এ প্রত্যাশা সবার।
মাগুরা