বাঙালি রসনাপ্রিয় জাতি। এখন সব খাবারেই যদি ফরমালিন আর ক্ষতিকর রাসায়নিকের চোখ রাঙানি থাকে, তাহলে খাবে কী? এসব থেকে বাঁচার কি কোনো উপায়ই নেই!
মাছ, সবজি, ফল—এসবে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে, তা এখন সবার জানা। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে খাদ্যে ভেজালের সংবেদনশীল ও ভয়ানক খবরগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় নিয়মিতভাবেই উঠে আসছে। গেল মাসে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ যেভাবে নিম্নমানের ৫২টি খাদ্যপণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে, সম্ভবত এই প্রথম নির্দিষ্টভাবে সর্বোচ্চ আদালত এমন নির্দেশ দিল। তবে এর আগেও দেখা গেছে, হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি। মানুষ ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো মাছ, ফল খেয়েছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফলও খেতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিদিন। অথচ ভেজাল চিহ্নিত হওয়ার পরেও দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। পরিস্থিতি একই রকম থেকে গেছে। এর ফলে ভোক্তাদের মধ্যে হতাশা, অসহায়ত্ববোধ আরও তীব্র হয়েছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দুঃখের বিষয়, গণমাধ্যমে নিরন্তর প্রচারণা, হাইকোর্টের নির্দেশনার পরেও থেমে নেই খাদ্যে ভেজাল ও বিষ প্রয়োগ। বিশেষজ্ঞরা খাদ্যে ভেজাল রোধে বিকল্প পদ্ধতির সন্ধানও দিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি গবেষক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বকসী বলেছেন, ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা তাদের পণ্যের অপচয় বা পচন রোধ করে মুনাফা ধরে রাখতে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশাচ্ছেন। এই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের যদি বাজারজাতকরণে স্বাস্থ্যসম্মত টেকসই পদ্ধতির চর্চা বাংলাদেশের জন্য প্রায়োগিক গবেষণার দ্বারা প্রচলন করা যায়, তাহলে এই ভেজাল কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে। টেকসই সমাধান শুধু স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প প্রক্রিয়ার প্রচলনের দ্বারাই সম্ভব।
তিনি বলছেন, বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়েই টাটকা শাক-সবজি বা ফলমূল পচন রোধে নানা প্রযুক্তির প্রচলন আছে। তেমনি টাটকা অবস্থায় সেসবের দীর্ঘ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও আছে। একইভাবে আছে ফলমূল কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা। কৃষক চাইলে একই জাতের গাছে আগাম ও স্বাভাবিক মৌসুমের ফল সংগ্রহ করতে পারে স্বাস্থ্যসম্মতভাবেই। তিনি বলছেন, সেই উন্নত প্রযুক্তি ও পদ্ধতিমূলক গবেষণা শুরুর এখনই সময়। সময় নষ্ট করার সময় নেই একেবারেই।
তিনি জানান, প্রচলিত উন্নত প্রযুক্তির স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশে তার প্রায়োগিক গবেষণা করে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করলেই ভেজাল রোধ করা সহজতর হবে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে খাদ্যের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি হবে বটে, কিন্তু তাতে টাটকা পণ্যের খাদ্যমান বজায় থাকবে, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হবে, সঙ্গে সঙ্গে মরণব্যাধির প্রকোপ কমবে, যা সর্বস্তরের মানুষের চিকিত্সা খরচ কমাবে।
ভেজাল খাদ্যপণ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি
১৯৯৪ সালে আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরমালিন ফুসফুস ও গলবিল এলাকায় ক্যানসার সৃষ্টি করে। ২০০৪ সালের পহেলা অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, গলবিল এলাকায় ক্যানসার সৃষ্টির জন্য ফরমালিনই দায়ী। টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহূত রং খাদ্য ও পানীয়ের সঙ্গে মিশে শরীরে প্রবেশের পর এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই, যার ক্ষতি করে না। তবে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ক্ষতিগুলো হয় আমাদের লিভার, কিডনি, হূিপণ্ড ও অস্থিমজ্জায়। ধীরে ধীরে এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চা ও বৃদ্ধদের বেলায় নষ্ট হয় তাড়াতাড়ি, তরুণদের কিছুটা দেরিতে।
খাদ্যপণ্যে ভেজালের কারণেই দেশে বিভিন্ন রকমের ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিউর, হূদ্যন্ত্রের অসুখ, হাঁপানি—এগুলো অনেক বেড়ে যাচ্ছে। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা দেশে প্রায় ১৫ লাখ।
কেমিক্যাল মিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো পেটে ব্যথাসহ বমি হওয়া, মাথা ঘোরা, মল পাতলা বা হজমবিঘ্নিত মল, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া এবং দুর্বল হয়ে যাওয়া, পালস্ রেট কমে বা বেড়ে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম জানান, ইউরিয়া ও হাইড্রোজ হচ্ছে এক ধরনের ক্ষার। এগুলো পেটে গেলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পেপটিন অ্যাসিড তৈরি করে যা ক্ষুধামন্দা, খাবারে অরুচি, বৃহদান্ত ও ক্ষুদ্রান্তে প্রদাহসহ নানা রকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে।
জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের ডা. আহমদ সাইফুল জব্বার জানান, মেটাল বেইজড ভেজাল খাবারে কিডনি স্বল্পমাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিকল হতে পারে। পরিপাকতন্ত্রে ভেজাল খাবারের জন্য হজমের গণ্ডগোল, ডায়রিয়া এবং বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের এনেসথেসিস্ট ডা. মো. মিল্লাত-ই-ইব্রাহীম জানান, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল উত্পাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে এ খাবারগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিষক্রিয়া কার্যকর থাকে। যা রান্না করার পরও অটুট থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় করে ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং, ফরমালিন, প্যারাথিয়ন ব্যবহার করা হয়। এগুলো গ্রহণের ফলে কিডনি, লিভার ফাংশন, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন প্রকার জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভেজাল খাবারের কারণে যে রোগগুলো দ্বারা মানুষ বেশি আক্রান্ত হয় তা হলো অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, খাদ্যে বিষক্রিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেন স্ট্রোক, কিডনি ফেলিউর, হার্ট অ্যাটাক প্রভৃতি।
মাছ ও সবজিতে ফরমালিন
শুধু ব্যবসায়িক ফায়দা লুটতেই ইউরিয়া, ফরমালিনসহ নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে মাছকে বিপজ্জনক বিষে পরিণত করা হচ্ছে। হাট-বাজার ঘুরে কেমিক্যালমুক্ত মাছ মেলা কঠিন। এজন্য জ্যান্ত মাছ কেনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর বরফ দেওয়া ও মৃত মাছ এড়িয়ে চলতে বলছেন তারা। সবুজ সবজিতেও ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে অবাধে। রাজধানীতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে শত শত বেকারি কারখানা। উত্পাদন ব্যয় কমাতে এসব বেকারির খাদ্যপণ্যে ভেজাল রং, নিম্নমানের আটা, ময়দা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্নমানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। বেকারির কারখানায় উত্পাদিত খাদ্যপণ্য সতেজ রাখতে ট্যালো, ফ্যাটি অ্যাসিড ও ইমউসাইল্টিং, টেক্সটাইল রংসহ নানা কেমিক্যালও ব্যবহার করতে দেখা যায়। এছাড়াও রয়েছে বিষাক্ত এনার্জি ড্রিংক ও জুস, মসলায় রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া প্রভৃতি মেশানো হচ্ছে।
গাজীপুরের জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির উপপরিচালক ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার জানান, ফরমালিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচার উপায় নেই। তবে কিছু টোটকা আছে | ইলিশ মাছের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলব, বাজারে খেয়াল রাখতে হবে ইলিশ মাছে মাছি বসছে কি না। ফরমালিন দেওয়া মাছে মাছি বসবে না। ফরমালিনযুক্ত মাছ, বিশেষ করে ফরমালিন ইনজেকশন দেওয়া মাছ শক্ত হবে। একটু নরম ইলিশ মাছে ফরমালিন থাকে না। ফরমালিন দেওয়া ইলিশ মাছের চোখ কালো হবে। স্বাভাবিক ইলিশ মাছের চোখ কালচে লাল বা ঘোলাটে হবে।
ফলে ছয় দফা কেমিক্যাল
বাজারের কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা থেকে শুরু করে আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। সাধারণ ফল-মূলের উজ্জ্বল রং ক্রেতাদের নজর কাড়ে, সেগুলো বিক্রিও হয় বেশি দামে। তাই অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল বর্ণে রূপান্তর করার জন্য অধিক ক্ষারজাতীয় টেক্সটাইল রং ব্যবহার হচ্ছে অবাধে। ফল গাছে থাকা পর্যায় থেকে বাজারে বিক্রি করা মুহূর্ত পর্যন্ত এক একটি ফলে ছয় দফা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। কেমিক্যাল মেশানো ফল চেনা অতটা কঠিন কিছু নয়, প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফলে সমান রং হবে না, বোঁটার অংশে লালছে আভা রং হবে এবং ফল মিষ্টি হবে। কৃত্রিমভাবে পাকানো ফলে সব অংশে সমান রং হবে এবং ফলের ভেতরে চামড়ার অংশে একটু তিতা হবে। তাছাড়া ফলের এক অংশে টক অন্য অংশে মিষ্টি হয়।