রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধানে ঢাকা-বেইজিং মতৈক্য

ঢাকা ও বেইজিং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্মত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই মতৈক্য হয়। গতকাল সন্ধ্যায় দিয়াওউয়াতি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বলেন, দুই নেতা প্রথমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সম্মত হয়ে বলেন, এটি অমীমাংসিত রাখা যাবে না। চীনের প্রেসিডেন্ট  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুইবছর পেরিয়ে গেছে। কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। রোহিঙ্গারা অবশ্যই তাদের নিজ দেশে ফিরে যাবে।

শহীদুল হক বলেন, উভয় নেতা উল্লেখ করেন যে এ ব্যাপারে দুই দেশের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করবেন এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তারা মিয়ানমারের ওপর ‘গুডউইল’ কাজে লাগাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিপিসি নেতার সাক্ষাত্

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সং তাও নিশ্চিত করেছেন যে, তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না (সিপিসি) সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। গতকাল শুক্রবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের দিয়াওউনতাই রাষ্ট্রীয় গেস্ট হাউজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্কালে সিপিসি নেতা এ আশ্বাস দেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভায় যোগদান এবং চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য প্রধানমন্ত্রী গত ১ জুলাই চীন সফরে যান। সিপিসি নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে প্রধানমন্ত্রীর   বক্তব্য লেখক মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।

সং তাও বলেন, সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আমরা অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়নের প্রশংসা করে তিনি আরো আশ্বস্ত করেন যে, এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে এবং বাংলাদেশে উন্নয়ন অভিযাত্রায় আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। সিপিসি নেতা বাংলাদেশের অত্যন্ত বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের উল্লেখ করে একে ‘বিশ্বে দুর্লভ’ বলে বর্ণনা করেন।

এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিগত অর্থবছরে ৮ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অপরদিকে, চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সিপিসি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মধ্যকার সম্পর্ক আরো গভীর হবে বলে সং তাও আশা প্রকাশ করেন।

বৈঠকের শুরুতেই সিপিসি নেতা চীন সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। চীনকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সিপিপির মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি ১৯৯৩ সালে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে চীনে তার প্রথম সফরকে স্মরণ করে বলেন, সফরের পর থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়। তিনি বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করব যাতে আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীন উভয়ের লক্ষ্য এক—দারিদ্র্য বিমোচন এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। তিনি বলেন, আমাদের সরকার লক্ষ্য অর্জনে অপ্রত্যাশিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা, ১৯৫২ ও ১৯৫৭ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চীন সফরের কথা স্মরণ করেন।

সিপিপি নেতা এই বইটি চীনা ভাষাতে অনুবাদ করার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, তারা প্রকাশ করার পর চীনা জনগণের মধ্যে বইটি বিতরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চীনা জনগণ ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে তার আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক ও চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম ফজলুল করিম অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনা বিপ্লবের বীরদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

আজ দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংর আমন্ত্রণে চীনে তাঁর ৫ দিনের সরকারি সফর শেষে আজ শনিবার দেশে ফিরছেন। স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট (বিজি-১৭২৩) ঢাকার উদ্দেশে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করবে। বিমানটির বাংলাদেশ সময় অপরাহ্নের পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।

চীন সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চীনের দালিয়ান শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) অ্যানুয়াল মিটিংয়ে যোগদান করেন এবং ‘কো-অপারেশন ইন দি প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. ফজলুল করিম ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা লেখক মো. নজরুল ইসলাম প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে, যা দেশের জন্য পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিকে থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারে সেজন্য বাংলাদেশ চীনের ‘গুড উইল’ কামনা করে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, তার দেশ এরআগেও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

পররাষ্ট্র সচিব চীনের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমরা চাই রোহিঙ্গারা ফেরত যাক।’

জিনপিং বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারে যেসব মন্ত্রী কাজ করেন তারা আবারও বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন। আশা করা যায়, এতে এ সংকট নিরসনের আরেকটি সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্টকে এ সংকটের বিষয়টি সুন্দরভাবে অবহিত করেন। ভোজ সভায়ও এ আলোচনা উঠে আসে।

শহীদুল হক বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন ছিল। আর প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্টকে তাদের ‘গুড উইল’ ব্যবহারের অনুরোধ জানান।

জিনপিং বলেন, যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টির সামনে উঠছে সেহেতু এর পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি বলেন, ‘আমরা এ সংকট সমাধানে যতটা সম্ভব চেষ্টা করব। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’দেশই আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের কাছে দু’দেশই সমান, কেউ কম বা বেশি নয়।’

চীনের প্রেসিডেন্ট আশ্বাস দেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’টিই যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু তারা (চীন) দু’দেশের স্বার্থই দেখবেন।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই নেতার মধ্যে বৈঠকটি খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ও উন্মুক্ত, যা বিভিন্ন সমীকরণ ও রসায়নের বহিঃপ্রকাশ।

বৈঠক চলাকালে দুই নেতার অঙ্গভঙ্গি উত্সাহব্যঞ্জক ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘ প্রধানমন্ত্রীকে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা পরস্পরের সত্যিকারের বন্ধু হয়ে থাকব।’ তিনি বলেন, ‘অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে দুই নেতার মধ্যকার সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে।’

শহীদুল হক বলেন, ‘একই সঙ্গে আমরা দেখতে পাই যে দু’দেশের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি পরিণত আখ্যান এসেছে।’

চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশকে চীনের বন্ধপ্রতিম প্রতিবেশী উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছি।’

জিনপিং বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করে বলেন, দু’দেশ পরস্পরের উন্নয়ন থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই নেতা গুরুত্বারোপ করে বলেন যে তাদের গন্তব্য হল জনগণের উন্নয়ন।

তিনি বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন বোঝাপড়া রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

জিনপিং দু’দেশ পরস্পরের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকারসমূহ বুঝতে পারে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি সম্পর্কের পরিপক্কতার বহিঃপ্রকাশ।’

চীনের প্রেসিডেন্ট তার দেশ সবসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা আশা করি এটি ভবিষ্যতে আরো গভীর ও জোরদার হবে।’

দুই নেতা বলেন, তারা দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।