সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এই ছবিটির কারিগর যিনি

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছবিয়াল সাদিক খান। শখের বসে ফুল, পাখি, গাছ, পাহাড়, ঝর্ণাকে ক্যামেরায় ধরে ফেলেন। সঙ্গে তোলেন স্ট্রেট আর পোর্ট্রেট ছবিও। সাদিকের তোলা ঈদ যাত্রায় ঘরে ফেরা মানুষের একটি ছবি আলোচনায় এসেছে দেশজুড়ে। কেবল দেশের গণ্ডিতে নয়, ঠাই পেয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। ট্রেনের ইঞ্জিনসহ পুরো ছাদ চেপে ঈদে ঘরমুখো মানুষের এমন দৃশ্য মন কেড়েছে নেটিজেনদের। প্রশংসায় ভাসছেন এই ছবিয়াল।

জামালপুরের মেলান্দহে বেড়ে উঠা সাদিক প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়েছেন ছোট থেকেই। তাই গাছপালা, লতাপাতা, পশু-পাখির সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা। এই সখ্যতা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে তার ক্যামেরার চোখে। প্রকৃতির রূপ-রস, নান্দনিক সৌন্দর্যকে তিনি ফ্রেমবন্দী করেন। সাদিকের ছবির হাতেখড়ি মোবাইলের ক্যামেরাতেই। প্রথমে ছবি তুলতেন একটি নোকিয়া বাটন মোবাইলের ক্যামেরায়। এরপর একটি অ্যান্ড্রোয়েড স্মার্টফোন পান। ছোটবোন টিউশনির টাকা জমিয়ে কিনে দিয়েছিলেন ফোনটি। দীর্ঘ নয় বছর মোবাইল ফটোগ্রাফির পরে হাতে আসে একটি সনি ক্যামেরা। এখন তার বহরে আছে নিকন ডি-৮৫০ মডেলের একটি ক্যামেরা ও নানারকম লেন্স ও সরঞ্জাম।

প্রকৃতির পাশাপাশি পোর্ট্রেট ছবি তুলতেও পছন্দ করেন সাদিক। তার সঙ্গে চেনা-অচেনা যেকোন মানুষের দেখা হলে স্মৃতি ধরে রাখতে অন্তত একবার হলেও তাদের মুখের ছবি তুলে রাখেন। দেশের তরুণদের মাঝে থিমেটিক বুক ফটোগ্রাফিকে জনপ্রিয় করতে কাজ করেছেন সাদিক। এজন্য সাহিত্যজগতে পাঠক লেখকদের কাছে তার বেশ পরিচিতি। বইমেলার সময়ে বইয়ের নানা বিষয়ভিত্তিক ছবি তুলতে সাদিকের ডাক পড়ে বিভিন্ন মহলে। তখন দম ফেলার ফুরসত মেলে না!

ঈদযাত্রায় ট্রেনভর্তি মানুষ। ছাদেও তিল ধারণের জায়গা নেই। আলোকচিত্রী সাদিক খানের তোলা এই ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল

সাদিক পড়ালেখা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদে। সেই সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন ময়মনসিংহ শহরের আনাচে-কানাচে। ফ্রেমবন্দী করেছেন ময়মনসিংহ শহর আর বাকৃবি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে।  এখন পড়ালেখার পাট চুকিয়ে শখের কাজ ফটোগ্রাফিতেই মেতে আছেন, বেছে নিয়েছেন পেশা হিসাবেও। এরপর আন্তর্জাতিক ট্র্যাভেল ফটোগ্রাফার হিসেবে দেশ-বিদেশে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা ভাবছেন। ছবির মাঝেই নিজের স্বপ্নকে আঁকতে পছন্দ করেন সাদিক। তিনি গল্প বলতে চান নিজের তোলা ছবিতে, গানে, কবিতা কিংবা উপন্যাসে। আর সে গল্পকে ফুটিয়ে তুলতে চান নিজের নির্মাণে। এজন্য ভবিষ্যতে চলচিত্র নির্মাতা হবারও স্বপ্ন দেখেন এই স্বপ্নবাজ তরুণ।     

সম্প্রতি আলোচিত হওয়া ‘নাড়ির টানে, বাড়ির পানে’ শিরোনামে ঈদ যাত্রার ছবিটি প্রসঙ্গে ইত্তেফাক প্রজন্মকে সাদিক বলেন, ‘বাকৃবিতে পড়ার সময় দেখেছি মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ট্রেনের ইঞ্জিনে, ছাদে চেপে ঝুঁকিপূর্ণ  ভাবে যাতায়াত করে। এবার নতুন ক্যামেরা হাতে পাওয়ায় এরকম একটা ছবি তোলার পরিকল্পনা করি। ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালি রেলব্রিজ থেকে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া জারিয়াগামী বলাকা কমিউটার ট্রেনের ছবি তুলি। পরে স্যোশাল মিডিয়ায় আপলোড করলে অল্পসময়ের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর দেশের অনেক গণমাধ্যম ছবিটি প্রকাশের অনুমতি চায়। বিকালে ভারতের ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ প্রথম পাতায় ছবিটি ছাপার প্রসঙ্গে যোগাযোগ করে’। সাদিক আরও বলেন, ‘আগেও আমার তোলা অনেক ছবি ভাইরাল হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের ছবি, কক্সবাজারে বৃদ্ধ দম্পতির সমুদ্রস্নানের ছবি, কুয়াশাচ্ছন্ন শম্ভুগঞ্জ রেলব্রীজের ছবি, বাকৃবি ক্যাম্পাসে রিক্সার পানিতে প্রতিচ্ছবির একটি ছবি। কিন্তু এবারের ঈদ যাত্রার ছবিটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গেছে।’

প্রথমদিকে সাদিকের যাত্রাপথ মসৃণ ছিলো না। পার হতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেধাবী তরুণ চাকরির প্রস্তুতি না নিয়ে স্বাধীনভাবে ছবি তুলে বেড়াবেন এটা যেন মানতেই পারতেন না পরিবার, স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা। প্রায়শই কটু কথা শুনতে হতো। স্বজনদের ভাষ্যমতে—মেধার অপচয় করছেন তিনি। কিন্তু সাদিকের তোলা ছবি নানা মহলে প্রশংসা পাওয়ার পরে দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে অনেকের। পরিবারই এখন সাদিককে বড় অনুপ্রেরণা যোগায়। 

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি সমাজের ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন সাদিক। ছবিতোলা থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ বিলিয়ে দেন তাদের কল্যাণে। ভবিষ্যতে তাদের জন্য একটি ফাউন্ডেশনও করতে চান।