গাজার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শিশুদের কণ্ঠ বিশ্বে পৌঁছে দিচ্ছেন আরিফ

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৬

যুদ্ধবিধ্বস্ত উত্তর গাজায় শিশুদের সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষিত করে তাদের দিয়ে মাঠপর্যায়ের খবর সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের রিমোট প্রডিউসার মোহাম্মদ আরিফুর রহমান শিবলী। আন্তর্জাতিক শিশু গণমাধ্যম ‘চাইল্ড মেসেজ ইংলিশ’-এর হয়ে কাজ করার সময় তিনি গাজার স্থানীয় শিশু সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেন এবং ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো গাজা থেকে সরাসরি সংবাদ প্রযোজনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

আরিফুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে রিমোটলি কাজ করে শিশু সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, স্টোরি নির্বাচন, অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া, স্ক্রিপ্ট তৈরি এবং সম্প্রচারের সময় নির্ধারণের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। মাঠপর্যায়ে ছিলেন আল জাজিরা আরবি বিভাগের ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা। তাঁদের সহায়তায় শিশু সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনা করতেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচারের জন্য ইংরেজি সাবটাইটেল প্রস্তুত করা হতো।

শিশুদের দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু
শিশু সাংবাদিকতা প্রকল্পের জন্য উত্তর গাজার কয়েকজন সাহসী স্কুলগামী শিশুকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের সমন্বয়ক খালেদের মাধ্যমে ২০২৩ সালের জানুয়ারির শেষদিকে ২১ জন শিশু আগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের মধ্য থেকে সম্প্রচারের জন্য নির্বাচিত হয় দিয়ালা হামাদ, শহীদ মোহাম্মদ সালা, আহমেদ আবু দাইয়া, আহমাদ সালাম ও মারিয়াম সালা আবদি। তাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এবং সবাই উত্তর গাজার বাসিন্দা।

ভাষাগত যোগাযোগ ছিল আরিফের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ফিলিস্তিনের প্রধান ভাষা আরবি হওয়ায় শুরুতে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন এআইভিত্তিক ভাষা-সহায়ক টুল ব্যবহার করে তিনি শিশু সাংবাদিক ও স্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

ক্ষুধা, হাসপাতাল ধ্বংস ও পানির সংকট
এই উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তর গাজার শিশু সাংবাদিক দিয়ালা হামাদের করা স্থানীয় শিশুদের ক্ষুধার্ত জীবন ও শিশু হাসপাতাল ধ্বংসের মতো প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভি-তেও ‘চাইল্ড মেসেজ’ থেকে এসব কনটেন্ট প্রচারিত হয়েছে।

আরিফ বলেন, ঢাকা থেকে তিনি স্টোরি নির্বাচন, স্ক্রিপ্ট লেখা, অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া এবং কোন প্রতিবেদন কখন সম্প্রচার হবে—এসব বিষয় সমন্বয় করতেন। অন্যদিকে গাজার মাঠপর্যায়ে থাকা সাংবাদিকরা শিশুদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন এবং শুটিং ও সম্পাদনার কাজে সহযোগিতা করতেন।

সহকর্মী শিশুর মৃত্যুর সংবাদ
এই কাজের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল শিশু সাংবাদিক মোহাম্মদ সালার মৃত্যু। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল ইসরায়েলি গুলিতে তিনি নিহত হন বলে জানান আরিফ।
তিনি বলেন, ২৬ এপ্রিল রাতে পরবর্তী সম্প্রচারে কোন শিশুকে যুক্ত করা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশ সময় রাত দেড়টার দিকে প্রকল্প সমন্বয়ক খালেদের কাছ থেকে মোহাম্মদ সালার নিহত হওয়ার খবর পান। সংবাদটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সালার মৃত্যুর পর শিশু সাংবাদিক আহমেদ আবু দাইয়াকে যুক্ত করা হয়। তিনি গাজার পানি সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করেন।

যুদ্ধের মধ্যে রিমোট প্রডিউসিং
গাজা থেকে রিমোট প্রডিউসার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই নানা প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে আরিফকে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল চার্জের সংকটের কারণে অনেক সময় শিশু সাংবাদিক কিংবা প্রকল্প সমন্বয়কের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকত। কখনো কখনো অ্যাসাইনমেন্টের ঠিক আগে ক্যাম্প থেকে দূরে গিয়ে যোগাযোগ করতে হতো।

আরিফের ভাষ্য, এমনও হয়েছে টানা তিন দিন কোনো শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে নানা আশঙ্কা তৈরি হতো। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মোবাইল যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়েও ছিল উদ্বেগ। তাই পুরো প্রকল্পে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণেই কেটেছে দীর্ঘ সময়
যুদ্ধের মধ্যেও শিশু সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতায় প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরিফ জানান, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত শিশু সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ওপরই মূলত গুরুত্ব দেওয়া হয়। আল জাজিরা আরবি বিভাগের সাংবাদিকরা মনে করতেন, আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা শেখার জন্য শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ের প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টের আগে শিশু সাংবাদিকদের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হতো।

আবারও শুরু হতে পারে গাজা থেকে সম্প্রচার
গাজা থেকে শিশু সাংবাদিকতার কার্যক্রম আবার শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন আরিফুর রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ বিভাগ এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ভবিষ্যতে গাজা থেকে আবার নিয়মিত শিশু সাংবাদিকতার প্রতিবেদন সম্প্রচার শুরু হতে পারে।

গাজায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তার কাছে শুধু সাংবাদিকতা বা প্রযোজনার কাজ নয়; বরং যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের কণ্ঠকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি দায়িত্ব। আরিফের স্বপ্ন, কোনো একদিন তাঁর শিশু সাংবাদিকদের একজন এমন একটি প্রতিবেদন করবে, যেখানে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংবাদ বিশ্ববাসী দেখবে।

“আমি স্বপ্ন দেখি, কোনো এক স্টোরিতে আমার শিশু সাংবাদিক ফিলিস্তিনকে দখলদারত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সংবাদ বিশ্বকে দেখাবে—এটাই আমার স্বপ্ন,” বলেন আরিফুর রহমান।

ইত্তেফাক/এএইচপি