আমাদের দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি প্রণয়ন করে। আচরণবিধি করা হয় প্রার্থী ও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। ইহার উদ্দেশ্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা এবং যে কোনো অনায্যতা, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দূর করা। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হইল, একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহার বিহিত করা হয় না। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয় না। জাতীয় নির্বাচনের চার মাসের মাথায় এখন দেশে বহিতেছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের হাওয়া। কিন্তু প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই শুরু হইয়াছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ। এমন সকল কর্মকাণ্ড সংঘটিত হইতেছে, যাহা অবিশ্বাস্য ও দুঃখজনক। যেমন—একটি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাকে প্রার্থী না হইতে থানায় তলব করিয়াছেন ওসি। ওসি কীভাবে এই কাজ করিতে পারেন এবং বলিতে পারেন যে, তিনি এখন বয়স্ক মানুষ, ঝামেলার দরকার কী? এইভাবে থানায় তলব করা এবং একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে অন্য প্রার্থীর প্ররোচনায় হুমকি দেওয়ার অর্থ কী? ইহা তিনি কোন আইন ও এক্তিয়ারবলে করিয়াছেন? নির্বাচন কমিশনের নিকট জাতি ইহা জানিতে চাহেন।
এই ঘটনায় সেই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন যে, এই দিনটি দেখিবার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী তাহাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেন, এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গেও যখন এমন আচরণ করা হয়, তখন আমরা যাইব কোথায়? এই জন্য কি মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রাখিয়া মহান একাত্তরে যুদ্ধ করিয়াছেন? আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে রহিয়াছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের জন্য আমরা পরাধীন পাকিস্তান আমলে লড়াই-সংগ্রাম করিয়াছি। অথচ আজ নির্বাচনি ব্যবস্থাই সবচাইতে হুমকির সম্মুখীন। এখানেই শেষ নহে, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় এক উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকে মারধর করা হইয়াছে। আরেক জন মহিলা পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য জামানতের টাকা জমা দিতে গেলে তাহাকে মারধর করিয়া ছিনাইয়া নেওয়া হইয়াছে কাগজপত্র। সংসদ সদস্য কিংবা তাহার পরিবার-পরিজন বা আত্মীয়স্বজন দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করিয়া কোনো কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চালাইয়া যাইতেছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘন করিয়া অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তো আছেই।
এইভাবে দেখা যাইতেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী দলগুলির অধিকাংশই মুখ ফিরাইয়া নিলেও এই নির্বাচনও অসহিংস, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হইতেছে না। ইহা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হওয়ার স্বার্থেই দলীয় প্রতীক উঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু অনেকেই নিঃশঙ্কচিত্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিতেছেন না। ইহার পূর্বে আমরা পৌরসভা ও জাতীয় নির্বাচনের সময় দেখিয়াছি, নির্বাচনের বহু পূর্ব হইতেই সম্ভাব্য প্রার্থী কিংবা তাহার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মী বা সমর্থকদের নানা মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়া গ্রেফতার করিয়া নির্বাচনকে একপাক্ষিক করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। সন্ত্রাসী হামলা, নির্বিচারে মামলা ও পুলিশি হয়রানির কারণে অনেককে ঘর ও এলাকাছাড়া হইয়া পালাইয়া বেড়াইতে হইয়াছে। ইহা কি সুষ্ঠু কোনো নির্বাচনি পরিবেশ হইতে পারে? অভিযোগ দেওয়া হইলেও এই ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না লওয়াটাই হইয়া উঠিয়াছে নিয়তি। এমনকি হাতেনাতে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট অনিয়ম ধরা পড়িলেও শেষ পর্যন্ত এই জন্য কাহাকেও কোনো শাস্তি পাইতে হয় নাই। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা লইয়া নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ থাকিলেও এক অর্থে তবু তো সেই নির্বাচন হইয়াছে। কিন্তু তাহার পর হইতে কী হইতেছে ও চলিতেছে, তাহা সচেতন মহলের অজানা নহে। সার্বিক পরিস্থিতি কি তাহার চাইতেও অধঃপতনের দিকে যাইতেছে না? নতুবা একজন থানার ওসি কীভাবে এতটা নাক গলাইতে পারেন এবং শক্তিশালী হইয়া উঠিতে পারেন? অতএব, যাহারা অতি উত্সাহী তাহাদের ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকিতে হইবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন বা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ত্বরিত পদক্ষেপ লওয়াই হইবে বুদ্ধিমানের কাজ।