চীনা ফাঁদে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার পাশে ভারত

চীনা ঋণের ফাঁদে এখনও জর্জরিত শ্রীলঙ্কা। অভিযোগ, চীন শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির পাশাপাশি দেশটির সার্বভৌমত্বও জিম্মি করে রাখতে চায়। দেশের সর্বনাশা পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ গর্জে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএএফ) থেকে প্রাপ্ত বেলআউট কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে দেশটির অর্থনীতিকে।

তবে চীনা ঋণের ফাঁদ থেকে কিছুতেই বের হতে পারছে না শ্রীলঙ্কা। চীনের সুদ মেটাতেই দ্বীপরাষ্ট্রটি হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানেও চীন একই ফর্মুলাকে কাজে লাগিয়েছে। তাই শত্রুতা ভুলে পাকিস্তানের শিল্পপতিরা এখন প্রধানমন্ত্রী মিয়া মুহাম্মদ শেহবাজ শরীফকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বাংলাদেশেও এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

চীনের অর্থায়ণে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর গড়ে ওঠে। চরা সুদে ধার নিয়ে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে গড়ে তোলেন এই বন্দর দুটি। কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না দেশটির বর্তমান সরকার।

মাহিন্দার অতিরিক্ত চীন নির্ভরতা শ্রীলঙ্কাকে বিপদে ফেলে দেয়। অনেক দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে হাম্বানটোটা নিয়ে। তবে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট রণিল বিক্রমাসিংহে বিপদ বুঝতে পেরে চীনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে চাইছেন। বেজিংয়ের বদলে তিনি এখন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছেন, চীনের মতো ভয়ঙ্কর আগ্রাসী মনোভাব ভারতের নেই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণেই বিশ্বাস করে দিল্লি। তাই শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যাওয়া দেশটির নাম ইন্ডিয়া। 

চীনের অর্থায়ণে গড়ে ওঠা হাম্বানটোটা বিমানবন্দর নিয়ে সঙ্কট বাড়ছিল। অনেকেই এই বিমানবন্দরটির সঙ্গে ‘সাদা হাতির’ তুলনা করতেন। কারণ অলাভজনক এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হাত ধরে শ্রীলঙ্কা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। বিমান ওঠানামা প্রায় বন্ধই ছিল। সেই আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো ভারতীয় সংস্থা। একটি রুশ সংস্থার সঙ্গে ভারতীয় সংস্থা যৌথ দায়িত্ব নিল মাত্তালা রাজাপাক্ষে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। ৩০ বছরের জন্য ভারত ও রাশিয়ার সংস্থাকে বিমানবন্দরটি হস্তান্তর করছে শ্রীলঙ্কা সরকার।

ভারতের সৌর্য অ্যারোনটিক্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং রাশিয়ার রিজিয়ন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রায় পরিত্যক্ত বিমানবন্দরটি পরিচালনা করবে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টেন্ডারের মাধ্যমেই এই দুটি সংস্থাকে বরাত দেওয়া হয়েছে বলে জানান শ্রীলঙ্কার সরকারি মুখপাত্র বান্দুলা গুণবর্ধণে।
রাজধানী কলম্বোর ২৪১ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এই বিমানবন্দরটি অবস্থিত। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে উদ্বোধন হয় এই বিমানবন্দরের।

সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের নামে নামাঙ্কিত মাত্তালা বিমানবন্দরটি প্রথম থেকেই ধুঁকতে থাকে। ২০১৬ সাল থেকেই বিমান ওঠানামা প্রায় বন্ধ। অথচ বিশালাকার এই বিমানবন্দের বছরে ১০ লাখ মানুষের যাতায়াত করার সুবিধা রয়েছে। বিমানবন্দরটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ২০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীনের এক্সিম ব্যাঙ্ক অত্যন্ত চরা সুদে ১৯০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। 

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অস্থির অবস্থার সময় থেকেই দিল্লি সবসময় কলম্বোর পাশে থেকেছে। অন্যান্য দেশও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ভারত দেশটির নতুন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট রণিল বিক্রমাসিংহের শাসনামলে  দ্বীপরাষ্ট্রটিকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করছে দিল্লি। বিমানবন্দর পরিচালনায় ভারতীয় সংস্থার আগ্রহেরও বড় কারণ দিল্লির কলম্বোর প্রতি বন্ধুত্বমূলক মানসিকতা বলেও কূটনৈতিক মহলের অনুমান। শ্রীলঙ্কার সংসদে এরজন্য সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন।