বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন ও সংগ্রামের স্বীকৃতির দিন মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রম অধিকার আদায়ের এই দিনটি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া যথাযথ মর্যাদায় পালিত হইয়া আসিতেছে। শ্রমিকদের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও দাবির প্রতি সম্মান জানাইয়া মে দিবস বা পহেলা মে ছুটির দিন হিসাবে পালন করে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ। এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য শ্রমিকদেরকে তাহাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, যেন তাহারা মে দিবসের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জানিতে পারেন এবং নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন। ১৮৮৬ হইতে ২০২৪ সাল। শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির পাশাপাশি যুক্তিসংগত কর্মসময় নির্ধারণের আন্দোলনের ১৩৯ বত্সরে শ্রমিকদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে বহু পরিবর্তন হইয়াছে আমাদের সমাজ ও সভ্যতার। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজিতে হয়—মানবসভ্যতার এত উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হইলেও শ্রমিকের অধিকার কি যথার্থরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে? দূর হইয়াছে তাহাদের বঞ্চনা?
অবশ্য শ্রমিকদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হইলেও যতটুকু অধিকার অর্জিত হইয়াছে, তাহা মে দিবসের পথ ধরিয়াই আসিয়াছে। বিশ্বব্যাপী ট্রেড ইউনিয়নগুলো শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করিয়া যাইতেছে। উন্নত দেশে এখন শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি কাজের পরিবেশও হইয়াছে উন্নত। তবে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশা এখনো কাটে নাই। বাংলাদেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। এই দেশে মুনাফা ও মজুরির যে বিরোধ—সেই বিরোধে শ্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ হইলেও দুর্বল ও শোষিত। যাহার ফলে খাদ্যপণ্য ও ব্যাবহারিক পণ্য উত্পাদনে রেকর্ড করিলেও তাহা সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে থাকিয়া যাইতেছে। তাহাদের আয়ের বড় একটি অংশ খাদ্য, বাড়িভাড়া, পোশাক, চিকিত্সায় ব্যয় হইয়া যাওয়ার ফলে সঞ্চয় যেমন থাকিতেছে না, তেমনি দক্ষতা অর্জনের জন্য বাড়তি খরচ করাও তাহাদের পক্ষে সম্ভব হইতেছে না। ইহার কারণে আমাদের দেশের শ্রমিকরা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করিতে না পারিয়া অদক্ষই রহিয়া যাইতেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ শ্রমশক্তির আবাসস্থল, যেইখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক টেক্সটাইল, কৃষিসহ বিভিন্ন রকমারি উত্পাদনে নিযুক্ত। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প চীনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক শিল্প। পূর্বের তুলনায় আমাদের দেশের শ্রমবাজারে বেশ কিছু অগ্রগতি সাধিত হইলেও দীর্ঘদিনের কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হইয়া পড়িয়াছে। আমাদের দেশের শ্রমিকদের অবস্থা এখনো মহান মে দিবসের আদর্শ হইতে যোজন যোজন দূরে। বাংলাদেশের শ্রমিকরা, বিশেষ করিয়া পোশাকশিল্পের সহিত যাহারা সম্পৃক্ত, তাহারা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন। অনেকেই মাথায় ঝুঁকি লইয়া অনিরাপদ পরিস্থিতিতে কাজ চালাইয়া যাইতেছেন। তাহা ছাড়াও শ্রমিক অধিকারকর্মী ও ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষুদ্র স্বার্থের রাজনীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের হয়রানি বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতায়নে ক্রমশই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতেছে।
প্রত্যেক বত্সর মে দিবস আসে, আবার চলিয়া যায়। কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন তেমন একটা নজরে পড়ে না। মে দিবস শুধু একটি উত্সব হিসাবে পালন না করিয়া এই দিনে বাস্তবেই শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে দূরত্ব ঘুচাইয়া শ্রমিকের নায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করিতে হবইবে। শ্রমিকের যেমন উচিত নিষ্ঠার সঙ্গে পূর্ণ ঘণ্টা শ্রম দেওয়া, তেমনি মালিকপক্ষের উচিত নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান করা। প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়িলে কার্যত উভয় পক্ষই লাভবান হইবেন। এই জন্য শ্রমিক ও মালিকবান্ধব আইন প্রণয়ন করিতে হইবে, যাহাতে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করিবার পাশাপাশি সমাজের অন্য সকল পেশার মতো শ্রমিকদেরও সমান মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণি হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করিবার গুরুত্ব অনুপেক্ষণীয়। মহান মে দিবসে দেশের সকল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি রহিল আমাদের অনাবিল শুভেচ্ছা।