দেশে মাদককারবারিদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বাড়িয়া চলিয়াছে। তাহাদের ঔদ্ধত্য এতটাই বাড়িয়া গিয়াছে, যাহা চিন্তাও করা যায় না। তাহারা তাহাদের অনৈতিক বাণিজ্য অব্যাহত রাখিতে হেন কোনো অপকর্ম নাই, যাহা করিতেছে না। এই জন্য তাহারা হুমকি-ধমকি হইতে শুরু করিয়া খুনখারাবি করিতেও পিছপা হইতেছে না। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন হইতে জানা যায় যে, তাহারা এখন মাদকবিরোধী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলিকেও টার্গেট করিতেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি তাহাদের জীবননাশের হুমকি দিতেছে। অর্থকড়ি দিয়া ম্যানেজ করিতে না পারিয়া তাহারা এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেপরোয়া ও মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে।
স্বর্ণ পাচার, কয়লা ও তৈল চুরি রমরমা অনৈতিক বাণিজ্য। চোরাকারবারিরা রপ্তানিমুখী বিভিন্ন ট্রাক, এমনকি জাহাজ হইতেও তৈল চুরি করিয়া রাতারাতি বড়লোক হইয়া থাকে। বর্তমানে তাহার চাইতেও লাভজনক হইল মাদকের কারবার। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, আমাদের দেশে যাহারা মাদককারবারি, আজ তাহারা কোনো না কোনোভাবে সরকারি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করিতেছে। ইহার কারণে তাহাদের দুঃসাহস আরো বাড়িয়া গিয়াছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-নীতি থাকিবার পরও কীভাবে দেশে মাদকের বিস্তার ঘটিতেছে? গাঁজা, মদ, হেরোইন, আফিম, চরস, মরফিন, কোকেন, প্যাথেডিন, মারিজুয়ানা, এলএসডি, ইলেক্সার, ফেনসিডিল ইত্যাদিকে ছাড়াইয়া গিয়া এখন এই জগতে ছড়ি ঘুরাইতেছে ইয়াবা। দেশে বর্তমানে সেই ইয়াবাসেবীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখের ওপর, যাহার ১৫ হইতে ২০ শতাংশ নারী। নূতন আরেকটি মাদকের নাম আইস। ইয়াবার তুলনায় অন্তত চার-পাঁচ গুণ বেশি মেথঅ্যামফিটামিন থাকায় ইহা অনেক বেশি বিষাক্ত। এই সকল মাদকের ভয়াল থাবায় পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি লাগিয়াই আছে।
এই কথা সত্য যে, সমগ্র পৃথিবীতেই মাদকের আগ্রাসন বাড়িতেছে। উন্নত দেশগুলিও মাদকসম্রাটদের মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে; কিন্তু আমাদের দেশে যেইভাবে প্রকাশ্যে মাদকের ক্রয়বিক্রয় চলিতেছে, তাহা উদ্বেগজনক। মাদক এখন পাওয়া যায় অনলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও। এমনকি জেলখানায় বসিয়াও পাওয়া যায়। মাদকের ব্যবসায় হইতে প্রাপ্ত অবৈধ অর্থ যাহারা রাজনৈতিক সিদ্ধি হাসিলে ব্যবহার করিতেছে, তাহারা আরো বিপজ্জনক। তাহাদের ব্যাপারে এখনই সতর্ক হইতে হইবে; ভাঙিয়া দিতে হইবে তাহাদের মাদকের নেটওয়ার্ক। এই জন্য সংশ্লিষ্ট থানাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের তত্পরতা বাড়াইতে হইবে। সরিষার ভিতরে ভূত থাকিলেও তাহা তাড়াইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদককারবারিদের অন্যতম রুটে পরিণত হইবার কারণেও এই দেশে অবাধে ঢুকিতেছে মাদক। তবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না পাইলে তাহারা এতটা বেপরোয়া রূপ ধারণ করিতে পারিত না। তাই নূতন করিয়া মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে।
আমাদের মূল বক্তব্য হইল, মাদককারবারিরা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়প্রশয়ে না থাকে, সেইদিকে লক্ষ রাখিতে হইবে। যাহারা সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী, তাহারাও কোনো কোনো এলাকায় জড়িত মাদক কারবারে। তাহারা সরকারি দলে থাকিয়া আত্মঘাতীমূলক কাজ করিতেছে। তাহাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হইলেও কেন দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে না—তাহাও একটি বড় প্রশ্ন। টেকনাফ হইতে নৌপথে পিরোজপুর, মংলা ও খুলনাসহ মাদকের বড় বড় চালান বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাইয়া যাইতেছে। শুধু সড়ক বা নৌপথেই নহে, এখন মাদকের বড় বড় চালান আসছে আকাশপথেও। এই জন্য রাজনৈতিক দলসহ সকল পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হইয়া মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে হইবে। যাহারা মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিসহ আন্দোলন-সংগ্রাম করিতেছেন, তাহাদের অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে হইবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখিতে হইলেও মাদকের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াইয়ের বিকল্প নাই।