একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যে সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় সেইগুলি মূলত দেশের সাধারণ জনগণের দুঃখ-কষ্ট, দৈন্য-দুর্দশা লাঘব করিবার জন্য। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সার্বিকভাবে উন্নয়ন খাতে যেই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়, সেই অনুযায়ী জনগণ যদি যথাযথ সুবিধা না পায় তাহা হইলে ঐ প্রকল্পগুলি এক প্রকার ব্যর্থই বলা চলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের হিসাব করিলে বিকল সরঞ্জামের সংখ্যা গণনা করিয়া শেষ করা যাইবে না। পূর্বে বিভিন্ন জটিল চিকিত্সার জন্য মানুষ ছিল রাজধানী ঢাকার উপর নির্ভরশীল। এখন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক উন্নত মানের স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়িয়া উঠিয়াছে; কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিবিচ্যুতি এখনো রহিয়া গিয়াছে। বর্তমানে গ্রামীণ ও মফস্সল এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা লইয়া পড়িয়াছে দোটানায়। অনেকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিত্সাসেবা নিতে পারিতেছে না ব্যয়বহুল হইবার কারণে। অন্য দিকে সরকারি খাতে চিকিত্সাসেবার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার জন্য সরকার যেই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, সেই অনুযায়ী চিকিত্সাসেবা সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে পাইবার কথা; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চার বত্সর ধরিয়া অব্যবহূত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে ১৯ কোটি টাকা দামের দুইটি ক্যাথল্যাব। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত সংবাদ হইতে জানা যায়—এই হাসপাতালে স্থাপনের জায়গা ও জনবলসংকটে দীর্ঘ চার বত্সরেও এনজিওগ্রাম ও হার্টের রিং বসানোর এই মেশিন চালু করা হয় নাই। ইহা ছাড়াও ১৮ কোটি টাকা দামের এমআরআই মেশিন তিন বত্সরেও ইনস্টল করা হয় নাই। পড়িয়া রহিয়াছে ৬ কোটি টাকার এক্সরে মেশিনও। প্রতিদিন শত শত হূদেরাগীর চিকিত্সার জন্য এনজিওগ্রাম করিবার প্রয়োজন পড়ে। এই সমস্ত রোগীর মধ্যে যাহাদের সামর্থ্য রহিয়াছে তাহারা ঢাকায় চলিয়া যান। বাকিরা চিকিত্সাসেবা হইতে বঞ্চিত হইয়া মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেন।
কোটি টাকা খরচ করিয়া সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত চিকিত্সাব্যবস্থা প্রদান করিবার পরেও তাহারা চিকিত্সার মতো মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত হইতেছেন যাহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। চলতি বত্সরের ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের প্রধান ছয়টি হাসপাতালের ১৯ ধরনের যন্ত্রের প্রায় ২৩৮টি চিকিত্সা সরঞ্জাম বিকল হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। এই যন্ত্রগুলির মধ্যে রহিয়াছে এক্সরে, এমআরআই, ইসিজি মেশিন, সিটি স্ক্যান, অটোক্লেভ, ডেন্টাল ডিভাইস, অক্সিজেন জেনারেটর ইত্যাদি। শুধু চিকিত্সাক্ষেত্র নহে, দেশের প্রায় সকল সেবা খাতে ভোগান্তি, অনিয়ম ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অসংখ্য সংবাদ প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হইতেছে। শিক্ষিত জনবল তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞান সরঞ্জাম, কম্পিউটার, প্রজেক্টর সরকার হইতে প্রদান করা হইয়াছে; কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই সকল ডিভাইস বিকল হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। হয়তো সামান্য মেরামত কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ করিলেই দামি যন্ত্রপাতিগুলি পুনরায় সচল করা যায়; কিন্তু দেখা যায়, যাহারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাহাদের অনেকেই ন্যূনতম দায়িত্বের পরিচয় দেন না। এই দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এই সকল উন্নত প্রযুক্তির পঠনপাঠন হইতে বঞ্চিত হইতেছে।
দেশের সার্বিক উন্নয়নের চিত্র তখনই উজ্জ্বল হইবে যখন তাহার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় লোকবল বা মেরামতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হইবে। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ যদি নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে এবং সততার সহিত পালন করে, তাহা হইলে এই ধরনের নিয়মের বিচ্যুতি কিংবা দায়িত্বহীনতার অপসংস্কৃতি হইতে আমরা ক্রমশ বাহির হইতে পারিব। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলিয়াছেন, ‘কোনো কার্য হাসিলের জন্য মানুষের দায়িত্ব পালনের সদিচ্ছা থাকিতে হইবে।’ সুতরাং শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই শেষ কথা নহে, মানুষের নৈতিক উন্নয়নের প্রতিও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রহিয়াছে। যেই বুদ্ধি ও বিবেকের কারণে আমরা আশরাফুল মাখলুকাত হইয়াছি—সেই বুদ্ধি ও বিবেকের প্রতিফলন আমাদের সমাজ গঠনে ঘটিতেছে কি না, তাহা খতাইয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে।