বাইশ বছরেও নির্মাণ হয়নি নিউ ডিএনসিসি মার্কেট

বিপাকে দোকান বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীরা

রফিকুল ইসলাম রবি

দীর্ঘ ২২ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ‘নিউ ডিএনসিসি মার্কেট’। ১৯৯৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে এখনো শেষ হয়নি। গত ১২ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে মার্কেটটি। দিনের বেলায়ও সেখানে অন্ধকার। ভূতুড়ে পরিবেশ। ফলে নানা অপরাধের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে ছয়তালা মার্কেটটি। মার্কেটের তলায় তলায় চলে মাদক সেবন। এছাড়া মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে সেখানে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, সময়মতো মার্কেট না হওয়ায় অনেক জায়গা ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। মাদকসেবীরা এখানে দিনে-রাতে নেশার আড্ডা বসায়। চলে জুয়াখেলা। ছিনতাইকারীরা তাদের পরিকল্পনা ও ভাগবাঁটোয়ারার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে ভবনটিকে। গত ১১ বছরে ভবনের ভেতরে ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এজন্য মার্কেটটি এড়িয়ে চলেন তারা।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে প্যারিস রোডে নিউ সোসাইটি মার্কেট ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য ছয় বিঘা জমির ওপর মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাজার সার্কেল বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগ সিটি করপোরেশনকে এ জন্য ছয় বিঘা জায়গা দেয়। নকশা অনুযায়ী জমির ওপর ছয়তলা মার্কেট ভবন নির্মাণ হওয়ার কথা। দুই কিস্তিতে ব্যাংকে ১৪ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা। মার্কেটের মোট দোকানের সংখ্যা ২ হাজার ৩৬৩টি। মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সিটি করপোরেশন মোট ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা সালামি আদায় করেছে। এর মধ্যে অবিভক্ত সিটি করপোরেশন আদায় করেছিল ১২ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা আর ডিএনসিসি আদায় করেছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ ইত্তেফাককে বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে ঐ মার্কেটের সালামির টাকা আদায় করা হয়েছে। টাকা তত্কালীন সিটি করপোরেশনের কাছে। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটিতে ভাগ হওয়ার সময় আমাদের কিছুই দেওয়া হয়নি।

দোকান বরাদ্দের টাকা দিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ২২ বছর ধরে একটি মার্কেটের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সিটি করপোরেশনের উদাসীনতার কারণে মার্কেটটি চালু হয়নি। অথচ বরাদ্দের নামে টাকা আদায় করে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মার্কেটের নির্মাণকাজও শেষ হচ্ছে না, দোকানও বুঝে পাচ্ছেন না। আবার টাকাও ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ ১২ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় মার্কেটটির আশপাশের এলাকা বেদখল হয়ে গেছে। মার্কেটের পশ্চিম পাশের কিছু অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। ভবনের নিচতলায় সারি করে রিকশা, ভ্যান ও ছোটো ছোটো পিকআপ রাখা আছে। মার্কেটের ভেতরে দিনের বেলা প্রবেশ করলেও গা শিউরে ওঠে। চারদিকে ভূতুড়ে পরিবেশ। দিনের বেলায়ও সেখানে অন্ধকার। বিশাল আয়তনের মার্কেটটির নিচতলায় সুনসান নীরবতা। তবে মার্কেটের ৪র্থ তলায় কয়েকজন যুবককে দেখা গেছে। বাতাসে ভেসে আসে মাদকের গন্ধ। এছাড়া ফেনসিডিলের বোতল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে মার্কেটের ভেতরে।

জানা যায়, ভবনের বেসমেন্ট ও প্রথম তলার কাজ শেষে ১৯৯৮ সালে মার্কেটটির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫ সালে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু হয়। ছয়তলা ভবনের কাঠামো নির্মিত হয়। কিন্তু চারপাশের দেওয়াল নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ বাদ রেখেই ২০০৭ সালে আবার নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় সিটি করপোরেশন। এরপর ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন বিভক্ত হলে মার্কেটের দায়িত্ব পায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ডিএনসিসি তার ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল বিভাগের মাধ্যমে মার্কেটের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু গত আট বছরেও নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

নির্মাণকাজ চলার সময় ঠিকাদারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বিরোধ দেখা দিলে প্রত্যেকবার নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ঠিকাদারেরা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়।

উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ আনোয়ারুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমি সাড়ে আট মাস আগে সিটি করপোরেশন থেকে চলে আসছি। প্রধান প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় তত্কালীন মেয়র আনিসুল হকসহ বহু চেষ্টা করেছিলাম মার্কেটের কাজ শুরু করতে। বুয়েটের কনসালটেন্সি দিয়ে আসছিলাম। বর্তমান অবস্থা বলতে পারব না।