দেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সাক্ষরতার আওতায় আনতে নেওয়া প্রকল্পের সুফল মিলছে না। ৪৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নকালে মাঠ পর্যায়ের সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। পাঁচ বছর পার হলেও প্রকল্পের অর্ধেক কাজও হয়নি।
স্থানীয় পর্যায়ের এনজিও দিয়ে শিখন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ১৫-৪৫ বছর বয়সীদের এই কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এনজিও এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এনজিও নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। সেইসঙ্গে বাস্তবায়নকারী এনজিগুলোর অদক্ষতাও উঠে এসেছে।
প্রকল্পটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো বাস্তবায়ন করছে। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ৪৫২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকলেও পরবর্তীতে তা চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল সবার জন্য শিক্ষা, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করা। একইসঙ্গে দেশের ১৫-৪৫ বছর বয়সী মোট ৪৫ লাখ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সাক্ষরতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করা।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির অগ্রগতি পরিবীক্ষণ করে আইএমইডি। সম্প্রতি প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে অনুমোদন হলেও প্রকল্পটি পুরোদমে শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষ দিকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় ৩৬.২৫ শতাংশ শিখন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশিষ্ট ৬৩.৭৫ শতাংশ শিখন কেন্দ্র স্থানীয় লোকদের বাসস্থান বা খোলা জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে। অনেক স্কুলে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষা উপকরণ সব শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছালেও এর মান নিয়ে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকদের যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ শিখন কেন্দ্রে টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চ ও অন্যান্য সরঞ্জাম নেই।
প্রকল্পভুক্ত ২৫০টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে ১৩৪টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মোট ৩৯ হাজার ৩১১টি শিখন কেন্দ্রে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে জরিপ থেকে সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি করার লক্ষ্য থাকলেও সেটি করা হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক এবং এ ক্ষেত্রে নারী ও বয়স্ক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নিরক্ষরদের নিয়ে এই কর্মসূচি পরিচালনা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকলেও মাত্র ২৫ ভাগ নিরক্ষর এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। বাকিদের মধ্যে ২৩ ভাগ শিক্ষার্থী আগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় নথিভুক্ত ছিল। ৪০ ভাগ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বাদ পড়েছিল। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক শফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, প্রকল্পটি মূলত এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে এনজিও নির্বাচন করতে অনেক সময় লেগেছে। তাছাড়া ক্রয় প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লেগে যাওয়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরুতে অনেক বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে মৌলিক সাক্ষরতার কাজ শুরু হলেও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ৭২.৩ শতাংশ। অর্থাত্ দেশে এখনো ৩ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ নিরক্ষর। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবায়নকারী এনজিও নির্বাচনে বিলম্ব, প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ের জন্য দরপত্র আহ্বানে ব্যর্থতা, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, ক্রয় কার্যক্রমে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা প্রকল্প বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর অসহযোগিতাও একটা কারণ ছিল। সার্বিকভাবে প্রকল্পটির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এ প্রকল্প থেকে সুফল পেতে আরো দক্ষতার সঙ্গে তদারকি বাড়াতে সুপারিশ করেছে আইএমইডি। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ না থাকায় বয়স্কদের মাঝে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ থাকছে না। তাই দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এনজিওগুলোর কার্যক্রমে আরো নিবিড়ভাবে তদারক করতে বলা হয়েছে।