ঝিনাইদহ শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় গাছের মগডালে দেখা যাচ্ছে দড়ি দিয়ে ঝোলানো এক ধরণের লাল রঙের কৌটা। তাতে বড় অক্ষরে লেখা—পাখির জন্য পানি। তীব্র তাপে খাল-বিলের পানি শুখিয়ে যাওয়ায় পাখিদের পানি খাওয়াতে এই উদ্যোগ নিয়েছেন পাখি প্রেমিক জহির রায়হান। জহির পেশায় রঙমিস্ত্রী। দেয়াললিখনেও সিদ্ধহস্ত। নিজের কাজের ফাঁকে ফাঁকে জনকল্যাণমূলক নানা কাজ যুক্ত হন তিনি। কখনো রাস্তার ধারে গাছ লাগান, নিজ খরচে দেয়ালে জনসচেতনতা মূলক বাণী লিখেন, আবার কখনো পাখির আবাসস্থান তৈরি করে দেন।
স্কুলের গণ্ডিতে পা রাখা না হলেও জহিরের লেখাপড়ার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। দরিদ্র কৃষক বাবার এই সন্তানকে পরিবারের হাল ধরতে হয় অল্পবয়সে। সে কাজের ফাঁকে গ্রামের এক শিক্ষকের কাছে শিখেছেন বাংলা পড়া ও লেখা। একদিন শখের বসে বালুতে কাঠি দিয়ে কয়েকটি বাক্য লিখেন। তা দেখে অনেকেই মুগ্ধ হন। জানান এ ছেলের হাতের লেখা ভারী চমৎকার। এ কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় এক মসজিদের দেয়ালে লেখার জন্য ডাক পড়ে জহিরের। সেখান থেকে শুরু জহিরের দেয়াল লেখনী। পরবর্তীতে বাসা-বাড়িতে রঙের কাজও নেন।
২০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নিজের এক বাল্যবন্ধুর সাথে আলাপচারিতার সময় জহিরের উপলব্ধি হয় সমাজ ও সমাজের মানুষের জন্য আমাদের নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু করা উচিৎ। নিজের সামর্থ্যের জায়গা থেকে যদি সবাই একটু একটু করে এগিয়ে আসে সমাজটা অনেক সুন্দর হয়ে উঠবে। সেই ভাবনা থেকে জহির রাস্তার ধারে গাছ লাগাতে শুরু করেন। গত ত্রিশ বছরে তিনি ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তালগাছ লাগিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার। অন্যান্য ফলজ বৃক্ষ লাগিয়েছেন ১০ হাজার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়িতেও শোভা পাচ্ছে জহিরের হাতে লাগানো গাছ। নিজের সামান্য আয় থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে এসব গাছের চারা কিনেছেন তিনি। কাজের ফাঁকে বিশেষ করে বিকাল বেলা বা ছুটির দিনে গাছের চারা হাতে বেরিয়ে পরেন বিভিন্ন অঞ্চলে। অবসরে এলাকার বিভিন্ন দেওয়ালে নিজের খরচে জনসচেতনতামূলক বাণীও লিখেন জহির।
এবছর তীব্র তাপপ্রবাহে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। পশুপাখিদেরও বেহাল দশা। বিশেষ করে খাল-বিলে, ডোবায় পানি শুখিয়ে যাওয়ায় পানির কষ্ট পেতে হচ্ছে। পাখিদের এই কষ্ট লাঘবে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি মুরগির খাবারের পাত্রে পানি ঢেলে গাছে ঝুলিয়ে দেন জহির। লক্ষ্য করেন অনেক পাখিরা এসে পরিতৃপ্ত হচ্ছে সেখানে। পরে খরচ কমাতে প্লাস্টিকের বোতলে করে পানি ঝুলিয়ে দেন। এভাবে ঝিনাইদহ সদরের বেশ কিছু গ্রামে প্রায় দুই শতাধিক পানির পাত্র ঝুলিয়েছেন জহির। ইত্তেফাককে জহির বলেন, ‘একজন রংমিস্ত্রী হয়ে আমার নিজের অবস্থা থেকে মানুষের কল্যাণে সবসময় কিছু না কিছু করার চেষ্টা করি। আমার দেখাদেখি অনেকেই এখন পশুপাখিদের যত্ন নিচ্ছেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন গুলো এগিয়ে আসছে। সমাজের সব মানুষ যদি এভাবে এগিয়ে আসতে থাকে আমরা সুন্দর বাসযোগ্য একটি পৃথিবী পাবো।’