দরজায় কড়া নাড়ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ সময় ২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে শুরু হচ্ছে কুড়ি ওভারের বিশ্ব আসর। ২২ গজের লড়াইয়ের উত্তাপে গা মাখছে ক্রিকেটবিশ্ব। কোন দলের কতদূর যাওয়ার সম্ভাবনা, সেই আলোচনাও চলছে। এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ২০ দল। তাদের শক্তি-দুর্বলতা ও সম্ভাবনা নিয়েই এই আয়োজন। আজ থাকছে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে-
শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট তখন আক্ষেপ-হতাশায় মোড়ানো। দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়ে দারুণ স্কোয়াড নিয়েও বারবার শেষ চৌকাঠ পেরোতে পারছিল না। ২০০৭ সালের পর ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও রানার্স-আপ হওয়ার ‘মিথ্যা’ সন্তুষ্টি তাদের। মাহেলা জয়াবর্ধনে-কুমার সাঙ্গাকারাদের হাত ধরেও ৫০ ওভারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা হয়নি দ্বীপ দেশটির।
ততদিনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও শুরু হয়ে গেছে। এখানেও তাদের দ্বিতীয়সেরা হওয়ার গল্প। ২০০৯ সালে কুড়ি ওভারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হয় শ্রীলঙ্কা। ২০১২ সালেও একই পরিণতি। ক্রিকেট ইতিহাস বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১২- ৫ বছরে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চারটিতে ফাইনাল খেলেছে শ্রীলঙ্কা। চারবারই একই ফল রানার্স-আপ।
১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতা লঙ্কানরা ভেঙে পড়েনি। ২০১৪ সালে এসে অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর শেষ হয় তাদের। জিতে নেয় নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এরপর আর কুড়ি ওভারের বিশ্ব আসরে সুবিধা করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে-দিলশানদের অবসরে শক্তি হারানো লঙ্কানদের পথে ফেরাতে পারেননি অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ-লাসিথ মালিঙ্গা।
মালিঙ্গা অবসরে গেছেন। তবে ম্যাথুজ এখনও খেলছেন। এবারের বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও আছেন এই অলরাউন্ডার। তবে এই দলটির প্রাণভোমরা এখন কুশল মেন্ডিস। টপ অর্ডারে ধারাবাহিক রান পাওয়া এই ব্যাটার হাত খুলে খেলতে পারেন। তার সঙ্গে চারিথ আসালাঙ্কা, পাথুম নিশাঙ্কা ও কামিন্দু মেন্ডিস আশা জাগাচ্ছেন লঙ্কানদের।
যদিও শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় শক্তি এখন বোলিং। লাসিথ মালিঙ্গা অবসরের গেলেও এই দলটিতে আছেন দুজন ‘মালিঙ্গা’। একজন নুয়ান তুশারা, আরেকজন মাথিশা পাথিরানা। শেষের জন শ্রীলঙ্কার বোলিং আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। চেন্নাই সুপার কিংসে এবার দারুণ সময় কাটিয়েছেন এই তরুণ। একই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলা মাহিশ থিকশানা সেরাটা দিতে না পারলেও তার সামর্থ্য জানা আছে ক্রিকেট বিশ্বের।
থিকশানা ছাড়াও স্পিন আক্রমণে রয়েছেন ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা। এবারের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার নেতৃত্ব এই লেগ স্পিনারের কাঁধে। তৃতীয় স্পিনার হিসেবে সঙ্গী হয়েছেন অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা দুনিথ ভেল্লালাগে।
সব মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড গড়েছে শ্রীলঙ্কা। বেশিরভাগ খেলোয়াড় একসঙ্গে খেলছেন কয়েক বছর। তাছাড়া সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও তাদের দুর্দান্ত। মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশে এসে জিতে গেছে কুড়ি ওভারের সিরিজ। বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের গ্রুপে রয়েছে লঙ্কানরা। ‘ডি’ গ্রুপে তাদের অন্য তিন প্রতিপক্ষ হলো- দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল ও নেদারল্যান্ডস।
একনজরে:
অধিনায়ক: ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা।
কোচ: ক্রিস সিলভারউড।
ডাকনাম: দ্য লায়ন্স।
র্যাংকিং: ৮।
বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে: ৮ বার (২০০৭, ২০০৯, ২০১০, ২০১২, ২০১৪, ২০১৬, ২০২১, ২০২২)।
বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: চ্যাম্পিয়ন- ২০১৪। রানার্স-আপ-২০০৯ ও ২০১২।
আগের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স
২০২২ সালের বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড খেলতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কাকে। ওই পর্ব সহজে উতরে সুপার টুয়েলভ নিশ্চিত করে লঙ্কানরা। তবে গ্রুপ-১-এ খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ৫ খেলায় ২ জয় ও ৩ হার হয়েছিল সঙ্গী। জয় পেয়েছিল আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে।
শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ সূচি
৩ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা (নিউইয়র্ক), রাত ৮-৩০ মিনিট
৮ জুন: বাংলাদেশ (ডালাস), সকাল ৬-৩০ মিনিট
১২ জুন: নেপাল (ফ্লোরিডা), ভোর ৫-৩০ মিনিট
১৭ জুন: নেদারল্যান্ডস (সেন্ট লুসিয়া), সকাল ৬-৩০ মিনিট
নজরে থাকবেন
কুশল মেন্ডিস
শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ে মূল অস্ত্র কুশল মেন্ডিস। দারুণ ধারাবাহিক এই ব্যাটার গড়ে দিতে পারেন পার্থক্য। শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ অনেকটাই নির্ভর করে তার ব্যাটিংয়ের ওপর। বিশ্বকাপেও তার দিকে তাকিয়ে থাকবে দলটি।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সবশেষ সিরিজে হেসেছে তার ব্যাট। সিলেটের শেষ করে করেন ৮৬ রান। এছাড়া লঙ্কানদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির একটি ম্যাচে সেঞ্চুরি পেয়েছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। অর্থাৎ, ফর্মে থেকেই কুড়ি ওভারের আসরে নামতে যাচ্ছে মেন্ডিস।
পাথুম নিশাঙ্কা
বিশ্বকাপে কুশল মেন্ডিসের সঙ্গে পাথুম নিশাঙ্কাকেই ওপেনারের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। ২৫ বছর বয়সী এই ব্যাটার দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে নামতে যাচ্ছে কুড়ি ওভারের বিশ্ব আসরে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি পেয়েছেন এ বছরের শুরুতে।
সেই ফর্ম তিনি কুড়ি ওভারের ক্রিকেটের রেখেছেন। এই ফরম্যাটে আফগানদের বিপক্ষে খেল সবশেষ ম্যাচে রিটার্ড হার্ট হওয়ার আগে মাত্র ৩০ বলে খেলেন ৬০ রানের ইনিংস।
মাথিশা পাথিরানা
বোলিংয়ে লাইনলেন্থ ঠিক রাখছে বিশ্বের যেকোনও ব্যাটারের সামনে ভয়ের অন্যনাম মাথিশা পাথিরানা। বলের অ্যাকুরেসিতে ঘাটতি বাদে সবচেয়ে সম্ভাবনা পেসার ‘বেবি মালিঙ্গা’খ্যাত পাথিরানা।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে ছন্নছাড়া বোলিং করলেও আইপিএলে তাকে দেখা গেছে দুর্দান্ত। চেন্নাই সুপার কিংসের এই পেসারের বল সমীহ করতে হয়েছে প্রতিপক্ষ পেসারদের। এই ধারা বিশ্বকাপে ধরে রাখলে তিনি হতে পারেন লঙ্কানদের নতুন ‘নায়ক’।
শক্তি
* ব্যাটিং-বোলিং মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড গড়েছে তারা।
* কুশল মেন্ডিস রয়েছেন দারুণ ফর্মে।
* আইপিএলে আলো ছড়িয়েছেন মাথিশা পাথিরানা।
* সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাদের সঙ্গী
দুর্বলতা
* টপ অর্ডার রান না পেলে বিপদ হতে পারে।
* ধারাবাহিকতার অভাব।
* বিশ্বকাপের আগে মাহিশ থিকশানাকে চেনা রূপে পাওয়া যায়নি।
* একাই ম্যাচ জেতাতে পারেন, এমন খেলোয়াড় নেই।
ভবিষ্যদ্বাণী: সুপার এইট।
শ্রীলঙ্কা স্কোয়াড: ভানিন্দু হাসারাঙ্গা (অধিনায়ক), চারিথ আসালাঙ্কা (সহ-অধিনায়ক), কুশল মেন্ডিস, পাথুম নিশাঙ্কা, কামিন্দু মেন্ডিস, সাদিরা সামারাবিক্রমা, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ, দাসুন শানাকা, ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা, মাহিশ থিকশানা, নুয়ান তুশারা, দিলশান মাধুশাঙ্কা, দুনিথ ভেল্লালাগে, দুষ্মন্থ চামিরা, মাথিশা পাথিরানা।