মানব পাচারে চীনাদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগের তীর বেশ উদ্বেগজনক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ সরব চীনাদের এই মানব পাচারের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশেরও অনেকে চীনাদের কারণে মানবপাচারের শিকার।
অভিযোগ, চীনারা সাধারণত চাকরির টোপ বা বিয়ের ভান করে তারা তরুণ প্রজন্মকে ফাসায়। তারপর বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত করে তাদের। তাদের এধরনের কাজকর্মের পীঠস্থান হচ্ছে মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওস। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার নারীরাও শিকার হচ্ছেন চীনা প্রতারণার। পাহাড়িদের বিয়ের নাম করে চীনে নিয়ে গিয়ে পতিতালয়ে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে।
চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হচ্ছে বেআইনি কর্মকাণ্ডে। তাই উদ্বেগ সর্বত্র। অভিযোগ, চীনা প্রশাসন অপরাধ রোধে মোটেই সক্রিয় নয়। মানব পাচারে চীনাদের অস্ত্র আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির বহু মানুষ পাচার-বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন। তবে পাচার চক্রের হদিশ পেয়েও বহু দেশ নীরব দর্শক। মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসেই সব থেকে বেশি হচ্ছে মানব পাচার। কিন্তু সিন্ডিকেটের প্রভাবে এই দেশগুলির সরকার অনেকটাই নীরব। ফলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শিকার হচ্ছেন মানব পাচারের। মানব পাচার বাণিজ্যে উড়ছে লক্ষ লক্ষ মার্কিন ডলার। অর্থের লোভে চীনা পাচার চক্র যুব সমাজকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ‘ইন্সটিটিউট অফ পিস’ তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনা অপরাধীদের যাবতীয় কাজকর্মের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মিয়ানমার। সেখান থেকেই গোটা দুনিয়ায় তাদের অপরাধের নেটওয়ার্ক চলছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ছাড়িয়ে চীনাদের পাচার চক্র গোটা দুনিয়াতেই বিস্তৃত।
গবেষণায় উঠে এসেছে, চীনা ব্যবসায়ী ঝাও উই এই সিন্ডিকেটের অন্যতম মাথা। ‘স্বর্ণ ত্রিভুজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বলে পরিচিত অপরাধ বাণিজ্যের মুক্তাঞ্চলে তার কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মানব পাচারই হচ্ছে তার আর্থিক লেনদেনের বড় হাতিয়ার।
ইন্সটিটিউট অফ পিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী মিয়ানমারের কোকাং এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মিলনস্থল। সেখান থেকেই চলছে অপরাধ জগত। স্বনিয়ন্ত্রিত এই স্বর্ণ ত্রিভুজ আজ মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচারের স্বর্ণভূমিতে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিচ্ছেন চীনা অপরাধীদের।
কোকাংয়ে চলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বাণিজ্য। বেআইনি ক্যাশিনো থেকে শুরু করে প্রতারণা চক্র, অপহরণ বাণিজ্য সবই নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকে। মাদক ও অস্ত্র চোরাকারবারেও মিয়ানমারে কোকাং এখন পরিচিত নাম। চীনের বিভিন্ন আদালতে এধরনের বহু অপরাধের নথি রয়েছে।
অভিযোগ, সব জেনেও চীনের কমিউনিস্ট সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। অপরাধীরা মিয়ানমারের মুক্তাঞ্চল থেকে গোটা দুনিয়ায় তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করছে। ফলে বাড়ছে অপরাধের সংখ্যা।
গত বছর থাই পুলিশের মানব পাচার বিভাগ ২৪৮টি মানব পাচারের মামলা নথিভুক্ত করেছে। ২০২১ সালে এধরনের অভিযোগ ছিল ১৮৮টি। এই তথ্য বলে দিচ্ছে, চীনা মদদে বেড়েই চলেছে মানব পাচার। এই মানব পাচারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাচার হওয়া ব্যক্তিদের অর্ধেকের বেশিই অনলাইনে চাকরির ফাঁদে পা দিয়ে ফেঁসে গেছেন।
রেডিও ফ্রি এশিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে থেকে ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত লাওস কর্তৃপক্ষ ৪৭৭ জন লাওস ও থাই যুবক-যুবতীকে উদ্ধার করেছে। এদের সকলেই বাধ্য হয়েছিল বিভিন্ন অসামাজিক কাজে। স্বর্ণ ত্রিভুজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাদের পাঠানো হয় ম্যাসেজ পার্লার ও পতিতালয়ে। নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে নিযুক্ত করা হয়। গোটা চক্রটাই ছিল চীনাদের নিয়ন্ত্রণে।
গত ডিসেম্বরে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে তিন থাই তরুণী চীনাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পান। উদ্ধার পেয়ে তারা শুনিয়েছে কীভাবে তাদের ফাঁসানো হয়েছিল।
মিয়ানমারের শান প্রদেশের এই তরুণীদের থাইল্যান্ডে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুককে হাতিয়ার করে প্রতারকরা সেখানে বিজ্ঞাপন দেয়। সেই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়েই এই তিন নারী চাকরির সন্ধানে চীনা প্রতারকদের জালে ফেসে যান। জানা যায়, দেহব্যবসা বা অন্যান্য অপরাধে যুক্ত করার জন্য যুবতীদের ধরে আনতে চীনাদের নেতৃত্বে একটা চক্র কাজ করছে।আসলে সবক্ষেত্রেই চীনাদের প্রতারণার জাল বেশ শক্তিশালী। অর্থনৈতিকভাবে তারা যেমন বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে হরণ করে চলেছে, তেমনি বিভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের পাচার বাণিজ্যকে প্রসারিত করছে। বাংলাদেশের মতোই বহু দেশ চীনাদের অমানবিক কাজের শিকার। হাসি মুখে মানুষকে বিপদে ফেলার কাজে চীনাদের জুড়ি নেই। প্রতারণার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারেও তারা সেরা।
কম্বোডিয়াও চীনাদের প্রতারণা ব্যবসার শিকার। মানব পাচারের জন্য এই দেশটির যুবক-যুবতীদেরও বেছে নিয়েছেন চীনা পাচারকারীরা। মেকং নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব পাচার কম্বোডিয়ার একটি সংগঠিত অপরাধ। চীনাদের পরিচালনায় রমরমা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে মানব পাচার। হাজার হাজার মানুষ এই মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত। কম্বোডিয়ায় এই মানব পাচার চক্রের পাণ্ডাও কিন্তু চীনা পাচারকারীরা। তারাই পরিচালনা করে থাকে গোটা সিন্ডিকেটকে। কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর খেং মানব পাচার প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নতুন ধরনের এক সর্বনাশা অপরাধ নৃশংসভাবে আমাদের গ্রাস করতে চাইছে’।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটসের প্রতিবেদনে চীনাদের মাধ্যমে মানব পাচার নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। সেখানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে, মানুষ পাচারে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন চীনা নাগরিকরা। চীন সরকারের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে জো বাইডেন প্রশাসন।