দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে শুরু হয় কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ। এই সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয় ওয়ারশ জোট। এই দুইটি সামরিক জোটের সহিত চুক্তিবদ্ধ নহে—এমন রাষ্ট্রগুলিই তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই সকল দেশ বিভিন্ন কলোনি শক্তি হইতে লাভ করে স্বাধীনতা; কিন্তু স্বাধীনতা লাভ করিলেও পোস্ট কলোনিয়েলজমের প্রভাব হইতে তাহারা অদ্যাবধি মুক্ত হইতে পারে নাই। বলিতে গেলে তাহারা স্বাধীনতা লাভ করিয়াও স্বাধীন হয় নাই। এই কারণে এত বত্সর পরও এই সকল দেশে রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী হইতে পারে নাই। ইহারই অন্যতম প্রতিফলন হইল নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, অনিশ্চয়তা, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অভাব ইত্যাদি। বিশেষ করিয়া এই সকল দেশে নির্বাচন মানে হইল পিটাপিটি, মারামারি, হানাহানি, খুনাখুনি ইত্যাদি।
অবশ্য ইহারও মধ্যে কোনো কোনো দেশে নির্বাচনি ব্যবস্থা কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করিয়াছে। আফ্রিকা মহাদেশের মতো কোনো কোনো দেশে দেখা দিতেছে বিশেষ উন্নতি। এমনকি নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া অবাঞ্ছিত ঘটনা যতই ঘটুক, দিন শেষে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে ফলাফল মানিয়া লইতেও দেখা যায়। কারণ অন্তত আর যাহাই হউক, এই সকল দেশে নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্ব হইতেই বিরোধী বা প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর ন্যক্কারজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দমন-পীড়ন চলেন না। তবে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ইহার বিপরীত চিত্রটিই লক্ষণীয়। অথচ কবি বলিয়াছেন, ‘এই দিন দিন নয়,/ আরো দিন আছে।/ এই দিন নিয়ে যাবে,/ সেই দিনের কাছে।’ হয়তো এমন একদিন আসিবে যখন এই সকল অন্যায় ও অনিয়মের জন্য তখন তাহাদের জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। এখনো প্রভাবশালী কাহারও কাহারও ক্ষেত্রে এমন ঘটনাও ঘটিতেছে যাহা তাহারা কিছুদিন পূর্বে দুঃস্বপ্নেও ভাবিতে পারেন নাই। নির্বাচনব্যবস্থার সহিত যাহারা সংশ্লিষ্ট, তাহাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। এই সকল দেশে পূর্বে তবু এক রকম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইত। এখন নির্বাচনে ভোটার এমনকি দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকাও হ্রাস পাইয়াছে। নির্বাচন এখন উঠাইয়া দিতেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন। স্পর্শকাতর বিভাগের সহিতও রহিয়াছে তাহাদের দহরম-মহরম ও যোগসাজশ। ইহার কারণে দেখা যায়, একতরফাভাবে নির্বাচনে জয়লাভ করিতে প্রতিপক্ষ প্রার্থী এবং তাহার সংগঠনের জাতীয় বা স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়া শুধু নির্বাচনি মাঠই নহে, তাহাদের এলাকা ও বাড়িছাড়াও করা হইতেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে একদা বামপন্থিরা যাহা করিয়াছিলেন, তাহাই এখন অনুসরণ করিতেছেন তথাকথিত উদারপন্থি বা উগ্রপন্থিরাও। শত বত্সর পরও যদি ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়, তখন আজ তাহারা যাহা করিতেছেন, তখন যদি নূতনভাবে ক্ষমতাসীনরা একই নীতি অনুসরণ করেন, তাহা হইলে আজিকার প্রভাবশালী বা উত্তরসূরিদের অবস্থা কী হইবে তাহা কি ভাবা যায়?
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে, তাহা হইলে সেই প্রশাসন রাখিয়া কী লাভ? ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হইল রাজনীতিবিদদের লালসা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অন্যায়-অনিয়মের লাগাম টানিয়া ধরা। প্রজাতন্ত্রের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসাবে সেই দেশের প্রজা বা সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা; কিন্তু আমলা যখন কামলা হইয়া যায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মতো আচরণ করেন কিংবা তাহাদের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া একাকার হইয়া যান, তখন এই আমলাতন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নাই। ইহার ফলে আজ হউক বা কাল হউক এই সকল দেশে নির্বাচনের সময় সর্বত্র নৈরাজ্য সৃষ্টি হইতে বাধ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ১৯৩৯ সালে পৃথিবীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ৭৩টি। এখন মোট রাষ্ট্র ২০৬টি। তাহার মধ্যে ১৯৩টি দেশ জাতিসংঘের সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৩৩টি দেশ স্বাধীন হইলেও কেন আজ অনেক দেশে নানা যুদ্ধবিগ্রহ, অশান্তি ও অনিশ্চয়তা রহিয়া গিয়াছে? কেন সেই সকল দেশে শান্তিবাহিনী পাঠাইবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতেছে? তাহার মানে, প্রকৃতপক্ষে এই সকল দেশ স্বাধীন হইয়াছে কি না, সেই প্রশ্ন থাকিয়া যায়। তাহার কারণ, একসময় যেইখানে পৃথিবীতে পরাশক্তি ছিল দুই-একটি, এখন সেইখানে ইতিমধ্যে বহুমাত্রিক শক্তিধরের সৃষ্টি হইয়াছে। তাহাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির মধ্য দিয়া নূতন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে চলিতে হয়। এই দেশগুলির জন্য ইহা কতটা দুঃখজনক বিষয়, তাহা ভাবিতে গেলে আমাদেরও মাথা ঘুরাইয়া যায়!