উন্নয়নশীল বিশ্ব যেইভাবে চলিতেছে, তাহা এইভাবে খুব বেশি দিন চলিতে পারে না। যেই সকল দেশে একের পর এক সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়া চলে। সেই সকল দেশের জনগণ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একদা আন্দোলন-সংগ্রাম গড়িয়া তোলে। নিজেদের জীবন উত্সর্গও করে। ইহার মাধ্যমে তাহারা যেই সকল অধিকার অর্জন করিতে চাহে, তাহা সাময়িক সময়ের জন্য পাইলেও আবার তাহারা হইয়া পড়ে সেই সকল অধিকারহারা। অতঃপর নূতনভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাহাদের লড়াই করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। দীর্ঘদিন পর এই সকল দেশের মানুষ শিক্ষাদীক্ষায় উন্নতি লাভ করিয়াছে। দেশবিদেশ ঘুরিয়া বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনকারী মানুষের সংখ্যাও বাড়িয়াছে। ইহা ছাড়া বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে এই গ্লোবাল বিশ্ব ক্রমেই ছোট হইয়া আসিতেছে। পরিণত হইয়াছে এক গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রামে। ইহাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সহিত তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির আদানপ্রদানও বাড়িয়াছে।
এমতাবস্থায় উন্নয়নশীল দেশ পরিচালনায় যাহারা আছেন, তাহাদের আরো সতর্ক হইবার প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন না করিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহারা সীমালঙ্ঘনের পরিচয় প্রদান করিতেছেন। এই সকল দেশের মানুষ কোর্ট-কাচারি ও অফিস-আদালতে গিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হইতেছে। বিচারের বাণী কাঁদিতেছে নীরবে-নিভৃতে। বিনা বিচারে অনেকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাইতেছে দিনের পর দিন। মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো মামলার কারণে নিরপরাধ ও অসহায় বনি আদমের কান্নায় আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কাঁপিয়া উঠিতেছে। এই সকল মামলা-মোকদ্দমার পিছনে লক্ষ লক্ষ টাকা জোগান দিতে গিয়া অনেকে নিঃস্ব হইয়া পথের ভিখারিতে পরিণত হইতেছে। যাহারা এইভাবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতেছে, তাহারা একদিন যে প্রতিবাদমুখর হইবে না, তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা হইতেই তাহারা শিখিতেছে প্রতিবাদের ভাষা। তাহারা যখন জাগিবে, তখন যদি এই সকল দেশে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, রক্তপাত ইত্যাদি দেখা দেয়, তখন সেই পরিস্থিতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে, তাহা কি কল্পনা করা যায়?
অতএব, কোনোভাবেই সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নহে। কেননা সীমালঙ্ঘনকারীকে সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন না এবং সীমালঙ্ঘনকারীর পতন অনিবার্য। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, পশ্চিম পাকিস্তানের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে পূর্ব পাকিস্তান মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে। ২৩ বত্সরের শাসনামলে তাহারা যেই সকল অন্যায়-অবিচার করিয়াছিলেন, তাহার মাশুল শেষপর্যন্ত তাহাদের দিতে হইয়াছে। অনুরূপভাবে বিশ্বের যে কোনো দেশে বা অঞ্চলে যে কেহই বাড়াবাড়ি করুন না কেন, ইহার জন্য আজ হউক বা কাল হউক, তাহাদের মূল্য দিতে হইবেই। ন্যাচারাল জাস্টিস বলিয়া যে কথা প্রচলিত রহিয়াছে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় আমরা তাহার প্রতিফলন দেখিতে পাই। যাহারা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সীমা লঙ্ঘন করেন, তাহাদেরও শেষ পরিণতি হয় একই। বাস্তবে এই সকল ঘটনা দেখিতে পাইয়াও কি আমরা শিক্ষা গ্রহণ করিব না? আমরা বলি না যে, কোনো দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম থাকিবে না; কিন্তু ইহা যেন সর্বদা সহনশীল থাকে, সেই প্রচেষ্টাই আমাদের চালাইয়া যাইতে হইবে।
প্রসঙ্গত, আমরা এই কথাও বলিতে চাই যে, আজ যাহারা বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে সীমা লঙ্ঘন করিতেছেন, পাখির মতো গুলি করিয়া মানুষ মারিতেছেন, মানুষের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি হাসপাতালে বিমান হামলা চালাইয়া গুঁড়াইয়া দিতেছেন, নারী ও শিশুদের হত্যা করিতেছেন, তাহাদের এই বাড়াবাড়ির পরিণামও কখনো শুভ হইবে না। সমস্ত পৃথিবী আজ স্তব্ধ হইয়া তাকাইয়া রহিয়াছে এই সকল বেদনাদায়ক ঘটনাবলির দিকে। আমরা আজ এমন এক বিশ্বে বসবাস করিতেছি, যেখানে আমাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করিবার নাই। এক শক্তিধর নেতা প্রতিবেশী এক দেশের উপর হামলা চালাইয়া তাহার বেশ কিছু অঞ্চল দখল করিয়া এখন তাহা ছাড়িতে নারাজ। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তি, যুদ্ধবিরতি ইত্যাদি শব্দগুলি শুনিতে ভালো লাগিলেও দুই পক্ষের যে নিরপরাধ হাজার হাজার মানুষ ইতিমধ্যে মারা গেল, তাহার বিচার কি হইবে না? আমরা মনে করি, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক যে পর্যায়েই হউক না কেন, সীমা লঙ্ঘন করিলে একদিন না একদিন ইহার কুফল ভোগ করিতে হইবেই। সুতরাং সময় থাকিতে এই ব্যাপারে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা কি উচিত নহে?