মড়ার উপর খাড়ার ঘা

হোসনে আরা বেগম

বাংলাদেশে গত দশ বছরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। এ উন্নয়ন অবশ্যই প্রশংসনীয়। বাংলাদেশে উত্তরোত্তর উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে প্রধানমন্ত্রী জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই বাজেটে দেশের জনগণ উপকৃত হবে। জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দেশে চলমান উন্নয়নের গতিধারা ও দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার সর্ববৃহত্ বাজেট দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কণ্ঠভোটে নির্দিষ্টকরণ বিল পাশের মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট পাশ হয়েছে। বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর-ভ্যাটের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সর্বসাধারণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। গ্যাস খাতে এবার সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড়ো মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ব্যাখ্যা দেন যে, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের বিশ্লেষণ হলো, দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির কারণে গ্রাহকপর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এই গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে অনেক পণ্য ও সেবার দাম বেশি বেড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’। পণ্যের দাম বেড়ে চললে এ শ্রেণির ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সহ্যসীমার বাইরে চলে যেতে পারে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে যাতায়াতের খরচ বাড়বে। একইসঙ্গে বাড়বে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস ইত্যাদির দাম। বেড়ে যাবে বাড়িভাড়া, রিকশাভাড়া, লঞ্চভাড়া, ট্রাকভাড়া ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশীয় পণ্যের বৃদ্ধির বহর দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এটা হতো না যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আয় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়ত।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কিছু কারণ আছে। আমাদের দেশের মানুষ বাস্তবতা বোঝেন। বাস্তব কারণে যৌক্তিক কিছু দাম এখানে সমন্বয় করা হয়েছে। জনগণের কোনো ভোগান্তি না হয়, সরকার সেদিকে সচেষ্ট থাকবে।’ মন্ত্রীর এ কথায় আমরা আশা করতে পারি, মূল্যবৃদ্ধিকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে মানুষের আয়ের পথ, রোজগারের পথ বাড়ানো হবে। যারা বেকার আছে, তাদেরকেও মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে।

কর্মসংস্থানের উপায় বার করলে দেশের তরুণ সমাজ নিজেদের উপযুক্ত করে দেশসেবায় এগিয়ে আসতে পারবে। এর জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কথায় কথায় দ্রব্যমূল্য বাড়াতে না পারে, সেদিকেও প্রশাসনকেই দৃষ্টি রাখতে হবে।

সমস্যা হলো, দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত প্রবীণদের নিয়ে। এরা হলেন বর্তমানে সমাজে সব থেকে অবহেলিত। এরা ইচ্ছা করলেই নিজেদেরকে যে কোনো কাজে লাগাতে পারবেন না। তাদের ব্যবসা বা শেয়ারবাজারে অর্থ লগ্নি করার বয়স বা মানসিকতা কোনোটাই থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম রোগশোক লেগেই থাকে। প্রবীণ বয়সেই সাধারণত কারো কারো হাঁটুব্যথা, কোমরব্যথা নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়ে। এছাড়া প্রেশার, ডায়াবেটিস, হার্ট, কিডনি ইত্যাদি জটিল রোগ অনেকেরই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অসুখ হলে ডাক্তার রোগ নির্ণয়ের জন্য একগাদা পরীক্ষা করতে দেন। রিপোর্ট দেখাতে গেলে আবার ফি দিতে হয়। প্রবীণ বলে কেউ কোনো রেয়াত করে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হলে সিরিয়াল নিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। সরকারি হাসপাতালে খরচ কম বলে সেখানে মানুষের ভিড়ে প্রবীণদের চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তারপরও মানসম্পন্ন চিকিত্সাসেবা পাওয়া ভার। যারা বয়সের ভারে হাঁটতে-চলতে পারেন না, তাদের হুইলচেয়ারেরও তেমন ব্যবস্থা থাকে না। প্রবীণ বয়সেই রোগশোক যেমন বেশি হয়, তেমনি ওষুধ, পথ্য, ডাক্তারের খরচও অনেক বেশি হয়।

প্রবীণ বয়সের কথা চিন্তা করে চাকরিজীবীরা যৌবনে নিজের আয় থেকে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে অবসরের পর প্রাপ্ত টাকা দিয়ে পরিবার সঞ্চয়পত্র বা পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনেন।

পরিবার সঞ্চয়পত্র ১৮ বা তদূর্ধ্ব বাংলাদেশি নারী এবং ৬৫ বা তদূর্ধ্ব নারী ও পুরুষ উভয়ে ক্রয় করতে পারেন। একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রয় করা যায়। সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশের টাকা দিয়ে যাতে ছেলেমেয়ে, পরিবার-পরিজন নিয়ে ভদ্রজনোচিতভাবে দিনাতিপাত করতে পারেন, সেই চিন্তা করেই কেউ কেউ তার জমানো সমুদয় টাকা লগ্নি করে সঞ্চয়পত্র কেনেন। সঞ্চয়পত্র তার নিরাপদ ভরসা। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়েই বৃদ্ধ বয়সে অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে কোনোরকমে মৌলিক চাহিদা অন্ন-বস্ত্র-চিকিত্সা-বাসস্থানের অভাব মেটাতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রবীণদের নিত্যদিনই হা-হুতাশ লেগে থাকে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্রের উেস কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ বলে মনে হচ্ছে। পুরোনো সঞ্চয়পত্র থেকেও বর্ধিত কর কেটে রাখা হচ্ছে। ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ সঞ্চয়পত্রের কুপনে যত টাকা লেখা আছে, টাকা তুলতে গেলে সেখান থেকে আরো শতকরা পাঁচ টাকা করে উেস কর কেটে রাখা হচ্ছে। জুন মাসের টাকা জুলাই মাসে তুলতে গেলে ব্যাংক সেখান থেকেও শতকরা পাঁচ টাকা কাটছে। জুনের হিসাবের সঙ্গে জুলাই মাসের সরকারি অর্ডারের সমন্বয় করে শতকরা পাঁচ টাকা কীভাবে কাটবে, ব্যাংক তা বলতে পারছে না। ধরা যাক, কেউ পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনে ছয় মাসের জন্য দেশের বাইরে গেছেন। ফিরে এসে টাকা তুলতে গেলে কি তার ছয় মাসের সঞ্চয়পত্রের কুপন থেকে বর্তমানের বর্ধিত হারে উেস কর কেটে রাখা হবে? এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ব্যাংকে নেই। প্রবীণদের নিরাপদ গচ্ছিত আমানতের টাকা যদি এমনিভাবে কমে যায়, তাহলে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়বে।

দেশে আজ উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। খুব শিগগির দেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। কিন্তু এই উন্নয়নের ফসল প্রবীণদের হাতে পৌঁছাবে কীভাবে? বিশেষ করে পঁয়ষট্টি বা তদূর্ধ্ব প্রবীণদের শারীরিকভাবে খেটে বা কোনো লাভজনক ব্যবসায়ে টাকা খাটিয়ে অতিরিক্ত টাকা উপার্জনের কোনো পথই খোলা নেই। আমাদের দেশে এই শ্রেণিভুক্ত প্রবীণের সংখ্যা খুব বেশি নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই সিনিয়র সিটিজেনদের উন্নত দেশের মতো সুযোগ-সুবিধাও নেই। তাই অন্তত তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের সঞ্চয়পত্রের লগ্নি করা টাকাটা কোনো লাভজনক ব্যবসায় খাটিয়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বাড়িয়ে উেস কর বাতিল করে দিলে তারা শেষ জীবনটা আনন্দে কাটাতে পারেন।

আমরা জানি, শেখ হাসিনার সরকার জনগণের সরকার। জনগণের কল্যাণ হয় এমন কাজ করাই এই সরকারের নীতি। বাংলাদেশের উচ্চবিত্তসহ আপামর জনসাধারণের নেত্রী তিনি। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা, মনন দিয়ে পর্যায়ক্রমে সবার পক্ষে যা লাভজনক হয়, তা-ই করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।

n লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন

স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আজিমপুর

গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা