লক্ষ্মণ সেনের স্মৃতি বিজড়িত ষাঁড়বুরুজ

সিকদার মোহাম্মদ জাকারিয়া

গম্ভীরা গানের নাম শুনলে যে অঞ্চলের নাম মনে পড়ে যায় তা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এটি প্রাচীন বাংলার একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এই জেলায় অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান হচ্ছে ষাঁড়বুরুজ। যা এই জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র রহনপুরে অবস্থিত। রহনপুর ও এর আশপাশের এলাকায় অগণিত প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন রয়েছে। ষাঁড়বুরুজ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্থান। এটি মূলত প্রাচীন বাংলার মধ্যযুগীয় সেন রাজবংশের চতুর্থ ও শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে দেখা যায় পাল রাজবংশের পতনের মধ্যদিয়ে সেন রাজবংশের সূচনা। অনুমান করা হয় একাদশ শতকের শেষের (১০৯৭-১২২৫ খ্রিস্টাব্দ) দিকে সেন রাজারা একটি ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। কালক্রমে এটিই বিশাল আকার ধারণ করেছিল। সেনদের আদি বাসস্থান কর্ণাটকের মহীশূর ও এর আশপাশের অঞ্চলে। সেনরা বীর সেনকে তাদের বংশীয় আদিপুরুষ হিসেবে বিশ্বাস করেন। সেনদের বাংলায় আগমনের সময়কাল না জানলেও ধারণা করা হয় যে সামন্ত সেনই প্রথম বাংলায় এসেছিলেন। তার পুত্র হেমন্ত সেন স্বাধীন সেন রাজ্যের  প্রতিষ্ঠাতা। এরপর রাজমুকুট লাভ করেন হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন। বিজয় সেনের মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে বসেন তার পুত্র বল্লাল সেন এবং তার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন লক্ষ্মণ সেন।

লক্ষ্মণ সেন হলেন সেন বংশের শেষ প্রভাবশালী রাজা। তিনি ১১৭৮ সাল হতে ১২০৬ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তার সময়ে তুর্কীদের হাত থেকে সাম্রাজ্য বাঁচাতে তার রাজধানী বিক্রমপুর থেকে নদীয়ায় অস্থায়ীভাবে স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। যুদ্ধের প্রতিটি ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অজস্র রক্তপাত। কিন্তু ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ  বখতিয়ার খলজী মাত্র সতেরো জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে নদীয়া আক্রমণ পরিচালনা করেন। বৃদ্ধ লক্ষ্মণ সেন তখন মধ্যাহ্নভোজে লিপ্ত ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি খালি পায়ে পিছনের দরজা দিয়ে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুরে যেয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখান থেকেই তিনি বাংলার শাসন পরিচালনা করেন। খলজী প্রায় বিনা বাধায় নদীয়া জয় করেন। মনে রাখা প্রয়োজন, খলজী সমগ্র বাংলা নয়, তিনি শুধু নদীয়া দখল করেছিলেন। 

রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় রহনপুর একটি বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। তিনি বাণিজ্যিক কারণেই রহনপুরে বড়ো বড়ো অট্টালিকা গড়ে তোলেন, যা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ষাঁড়বুরুজ, নওদাবুরুজ নামেও পরিচিত, অট্টালিকাটির প্রকৃত নাম ‘শাহবুরুজ’। শাহ শব্দের অর্থ ‘বাদশা’ আর বুরুজ শব্দের অর্থ ‘অট্টালিকা বা বালাখানা’। যা পরবর্তীকালে লোকমুখে ষাঁড়বুরুজ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

ষাঁড়বুরুজ এর অদূরে গুমুজ নামে একটি ভবন ছিল। জানা যায় যে, এটি রাজা লক্ষ্মণ সেনের বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং তিনি সেখানে তার দরবার চালাতেন। ষাঁড়বুরুজ নামক সেই অট্টালিকাটি ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ছে। যা দেখতে একটি ছোটো পাহাড়ের মতো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ ভগ্ন ভবনের স্তূপের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের বনজ গাছপালা লাগালেও সেগুলো সংরক্ষণের অভাবে অনেক গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেছে।

বর্তমানে বিলুপ্তির পথে এই ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনটি সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদন পল্লিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এতে করে আমাদের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এই সম্পর্কে জানতে পারবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়