গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি ও অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন। গতকাল রবিবার সংসদে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে তিনি বলেছেন, বাজেট পাশের মাত্র ছয় ঘণ্টার মাথায় বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) গ্যাসের দাম বাড়ালো। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি না করার বিষয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে, আদালত রুল জারি করেছিল। আদালতের রুল উপেক্ষা করে এবং সংসদে আলোচনা ছাড়া দাম বাড়ানো হলো। এর মাধ্যমে আদালত, সংসদ সদস্যদের ও জনগণকে অবমাননা করা হয়েছে।
মাগরিবের আগে গতকাল সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। জাসদের এমপি শিরীন আখতারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে ড. রাজ্জাক বলেন, গ্যাসের দাম বেশ কয়েকবার বেড়েছে এবং প্রতিক্রিয়াও হয়েছে যে দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। স্বীকার করি দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরেও বলবো- গ্যাসের দাম বাড়ানোয় পরোক্ষভাবে সবাই লাভবান হবে।
পয়েন্ট অব অর্ডারে মেনন বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সংসদে আলোচনার জন্য কার্যপ্রণালী বিধি ৬৮ অনুযায়ী আমি একটি নোটিশ দিয়েছি। নোটিশকে সমর্থন করেছেন এই সংসদের সদস্য হাসানুল হক ইনু, মইন উদ্দীন খান বাদল, ফজলে হোসেন বাদশা ও বেগম লুত্ফুন্নেসা খান। আশা করি এমপিদের বক্তব্য শোনার জন্য নোটিশটি গ্রহণ করা হবে। এসময় তিনি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সংসদে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রীর (নসরুল হামিদ বিপু) বিবৃতি দাবি করেন। এসময় সংসদে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, আপনার নোটিশটি স্পিকারের বিবেচনাধীন। এর আগে প্রতিমন্ত্রীকে আমি বিবৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে চাচ্ছি না।
ওয়াকার্স পার্টি সভাপতি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ায় শিল্প-পরিবহনসহ সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। গ্যাসের দাম বাড়ানোয় জনগণের মধ্যে হতাশা আছে, এটা প্রশ্নোত্তরে কৃষিমন্ত্রীও বলেছেন। আমি নিজেও হতাশ। বাজেট বক্তৃতায় আমি গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আলোচনা হয়নি, কিন্তু বাজেট পাশের পরই দাম বাড়ানো হলো। অথচ বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন- বাজেটের পর কোনো কিছুর দাম বাড়বে না।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গতকাল সারাদেশে বাম গণতান্ত্রিক জোটের আধাবেলার হরতাল প্রসঙ্গ তুলে মেনন বলেন, এই হরতালকে বিএনপি সমর্থন দিয়েছিল, সমর্থন দিলেও তারা রাস্তায় নামেনি। হরতাল হয়েছে কী হয়নি, কতটুকু হয়েছে, অন্যান্য দিনের চেয়ে যানজট বেশি ছিল- একথা বলে কূটতর্ক করে লাভ নেই। ভারত ১০০০ সিএফটি এলএনজি আমদানি করে সাড়ে ৬ ডলারে, আমরা আমদানি করি সাড়ে ১০ ডলারে। এলপিজির দাম বাড়লে সিএনজি বন্ধ হয়ে যাবে। আসলে এলপিজির বাজার ঠিক করার জন্যই কী এই সিদ্ধান্ত?
প্রশ্নোত্তর পর্বে জাসদের শিরীন আখতারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী ড. রাজ্জাক বলেন, বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে গ্যাস, কয়লা বা ডিজেল লাগে। এতে আমাদের অনেক ভর্তুকি দিতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা করতে হবে বিদ্যুত্ত্ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে কিছুটা দাম বাড়লেও এর নানামুখী প্রভাব, অর্থাত্ শিল্পকারখানা স্থাপনসহ সার্বিক অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটা বিবেচনা করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, সবসময় যদি সরকারকে ভর্তুকি দিতেই হয় তাহলে কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। কাজেই সবদিক বিচার-বিবেচনা করে দাম বাড়াতে হয়েছে। এতে কিছু কিছু মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরোক্ষভাবে আমরা সবাই লাভবান হবো। সার্বিক অর্থনীতির ওপরে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের দেশে বড় প্রয়োজন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করছে। তারা লেখাপড়া শেষে কিন্তু গ্রামের মাঠে গিয়ে আর কৃষিকাজ করবে না। তাদের জন্য চাকরি দরকার। সেই চাকরির জন্য শিল্পকারখানা করা দরকার। আর শিল্পকারখানার জন্য সব থেকে বড় অন্তরায় ছিল জ্বালানি। আমরা এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করে গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট আসছে। বেসরকারি খাতের সামিট পাওয়ার ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট আনছে। ফলে অনেকটা স্বস্তি এসেছে।
সম্পূরক প্রশ্নে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপি ফখরুল ইমাম সংসদের অধিবেশন চলমান অবস্থায় সংসদকে না জানিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো বৈধ কিনা, তা জানতে চান। জবাবে মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই। সংসদ সদস্য নোটিশ দিলে সঠিক উত্তর পাবেন। কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন বিদ্যুতের উত্পাদন ছিল ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ৫ বছর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা ১ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ও যোগ করতে পারেনি। এখন ১৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে। শিল্পকারখানা সচল ও রফতানি আয় বাড়ানোর জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে। সুতরাং রাজনীতি না করে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে।