নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা

উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনের পূর্বে ও নির্বাচনের দিন তো বটেই, নির্বাচনের পরও সহিংসতা চলাটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহার জের চলে মাসের পর মাস, এমনকি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া। বিশেষত আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ইহা একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হইয়াছে। এই নেতিবাচক সংস্কৃতির অবসান কবে হইবে—তাহা কেহ জানে না। গতকাল আনন্দবাজারের অনলাইনের এক খবরে বলা হইয়াছে যে, উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের পর এইবার বুলডোজার রাজনীতি অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর। সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্মোহন রেড্ডির দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সদর দপ্তর গতকাল ভোরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ক্যাপিটাল রিজিওন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিআরডিএ) বুলডোজার দিয়া গুঁড়াইয়া দিয়াছে। নির্বাচন শেষ হইবার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বিরোধী দলের রাজনৈতিক সদর দপ্তর বুলডোজার দিয়া ভাঙিয়া দেওয়ায় প্রশ্ন উঠাটা অস্বাভাবিক নহে। এই দিকে লোকসভা নির্বাচনের পর একই রূপ প্রতিহিংসার অনলে জ্বলিতেছে পশ্চিমবঙ্গ। এইখানে বরং পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক। মারামারি, হানাহানি ও খুনাখুনি এখনো লাগিয়াই আছে। অব্যাহত রহিয়াছে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের উপর হামলা-মামলা। এইখানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইয়াছে যে, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করিয়াও সহিংসতা বন্ধ করা যাইতেছে না।

কথায় আছে, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরায়’। এই উপমহাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচন আসিলেই কিংবা নির্বাচনের নাম লইলেই বিরোধী দল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা দুর্বল-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তরাত্মা কাঁপিয়া উঠে। কেননা নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নানা ছুতায় ও অজুহাতে চলে ধরপাকড়। মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়া চলে হয়রানি। নির্বাচনের পূর্ব হইতেই নূতন ও পুরাতন মামলাগুলি গতিশীল হয়। তড়িঘড়ি করিয়া রায়ও দেওয়া হয়। এমনকি শীর্ষনেতাসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে পুরিয়া রাখা হয়। বিশেষত স্থানীয় পর্যায়ে কোথাও কোথাও সৃষ্টি করা হয় ত্রাসের রাজত্ব। ইহাতে সেইখানে বসবাস করাটাই কঠিন হইয়া পড়ে। এলাকায় এলাকায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। তাহাদের সহিত গড়িয়া উঠে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির লোকের যোগসাজশ ও অশুভ আঁতাঁত। এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকজনও অনেক সময় আচরণ করেন দলীয় কর্মীর মতো। সরকারি দল ও আমলাতন্ত্র মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া যায়। ফলে উন্নয়নশীল এই সকল দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া অস্থিরতা ও সংঘাত-সংঘর্ষ চলিতেই থাকে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে গত মে মাসে ১৩৯টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং অন্তত ৫৯১ জন আহত হইয়াছেন। তাহার পূর্ব মাসে ১৭টি নির্বাচনি সহিংসতায় পাঁচ জন নিহত এবং ৮০ জন আহত হইয়াছেন। এখনো সেইখানে এমন সহিংসতা বিদ্যমান।

উন্নয়নশীল দেশে শুধু যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর দমন-পীড়ন চলে, তাহা নহে। এই সকল দেশে অধিকাংশ সময় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় যখন নিজেরা নিজেরা মিলিয়া নির্বাচন আয়োজন করা হয়, তখনও নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এমন অস্থিরতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে। ইহার চাইতে দুঃখজনক আর কী হইতে পারে? তখন নিজ দলের বা জোটের যেই সকল প্রার্থী বা নেতাকর্মী পছন্দের নহে, তাহাদের উপর চলিয়া থাকে স্টিমরোলার। ইহাতে দেখা যায়, নির্বাচন শেষ হইলেও মারামারি ও খুনাখুনি শেষ হয় না। দ্বিমুখী-ত্রিমুখী সংঘাত চলিতে থাকে। নতুন করিয়া বৃদ্ধি পায় চাঁদাবাজিও। ইহাতে এমন বিষময় পরিবেশে সাধারণ মানুষের দম বন্ধ হইয়া আসিবার উপক্রম হয়। কখনো কখনো নির্বাচনোত্তর সহিংসতা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নানা কৌশল-অপকৌশলের প্রতিক্রিয়ায় দেশ অস্থিতিশীল হইয়া পড়ে। ইহার জের পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত চলিবে বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। এই সকল দেশে নির্বাচনে এখন ভোটার বা দলীয় কর্মীর চাইতে এই সকল ক্যাডার-মাস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়া গিয়াছে, যাহা উদ্বেগজনক। এইভাবে আমলাতন্ত্র ও ক্যাডারতন্ত্রের মাধ্যমে সমগ্র দেশ নিয়ন্ত্রণের এই অপকৌশল দীর্ঘ দিন চলিতে পারে না। আজ হউক বা কাল হউক, ইহা যে একসময় বুমেরাং হইবে না, তাহারই-বা নিশ্চয়তা কোথায়?