প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নহে, অভিযোগ ব্যক্তির বিরুদ্ধে

কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির কারণে কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হইতে পারে? আমরা দেখিতেছি, ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য হিসাবে বিবেচনা করা হইতেছে; কিন্তু ব্যক্তি তো প্রতিষ্ঠান নহে। যাহারা অন্যায় করিতেছে, তাহাদের নিয়মপরিপন্থি কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলিলে তাহা কেন সেই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করিবে? কাহারো ইহা বলিবার সুযোগ নাই যে, পুলিশের সকলেই খারাপ। কাহারো ইহাও বলিবার সুযোগ নাই যে, রাজনীতিবিদরা সকলেই খারাপ। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এমন কোনো রাজনীতিবিদ নাই, যাহার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ উঠে নাই। অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবেও অভিযোগ উঠিতে পারে। তাহার মানে এই নহে যে, অভিযোগ উঠিতেই তাহা সঠিক হইবে।

পৃথিবীর সকল দেশেই কমবেশি দুর্নীতি রহিয়াছে। কেহ ধরা খায়, কেহ খায় না। একজন বিদেশি দায়িত্বশীল মন্ত্রী অন্য আরেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে কেবল একটি ঘড়ি উপহার নিয়াছিলেন বলিয়া তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠিয়াছিল। সেই উপহারের ঘড়ি তিনি বাড়িতেও নেন নাই, তাহার অফিসেরই ড্রয়ারে রাখিয়াছিলেন; কিন্তু এইটুকু অভিযোগেই সেই বিদেশি দায়িত্বশীল মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। বিভিন্ন দেশের এই ধরনের ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত আমরা দেখাইতে পারিব। এখন, এইখানে বলিতে হয় আমাদের দেশের দায়িত্বশীল পদের কর্তাব্যক্তিদের কাণ্ডজ্ঞানের কথা। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বসবাস করে। সুতরাং একজন কর্মকর্তা কীভাবে চলেন, কী বাজার করেন, কেমন বাড়িতে থাকেন, কী গাড়িতে চড়েন—তাহা তাহার আশপাশের মানুষের নিকট লুকাইয়া রাখিবার কোনো সুযোগ নাই। এইখানে একজন রিকশাওয়ালার নিকট যদি জানিতে চাওয়া হয়, তাহার এলাকার ট্রাফিক পুলিশ কেমন—স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাইবে। ট্রাক ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করিলে জানা যাইবে, হাইওয়ে পুলিশ কেমন। দেখা যাইবে অবৈধ উপার্জনের নহর বহিতেছে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে। কিন্তু তাই বলিয়া কি সকলেই চোর, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ? তাহা মোটেই নহে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই রহিয়াছেন, যাহারা হারাম উপার্জনের কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেন না। একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত হইলে সেই দেশে মানুষ বসবাস করিতে পারিত না। অনেক পুলিশ একদিকে নিরপরাধের পকেটে ইয়াবা ঢুকাইয়া দিয়া মাদক মামলা দেয়, অন্যদিকে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে মাসোহারা লয়, তেমনি এই পুলিশের অনেক সদস্য তাহার ন্যায়নিষ্ঠ দায়দায়িত্ব সততার সহিত পালন করেন। আমরাই তো অসংখ্যবার বলিয়াছি যে, পুলিশ জনগণের বন্ধু। এবং পুলিশ না থাকিলে স্বস্তিতে বা শান্তিতে একটি দিনও বসবাস করা সম্ভব নহে। বিপদে পড়িলে পুলিশকেই আমরা ডাকি। যেইখানে পুলিশ নিকটে থাকে না, সেইখানে হটলাইন ৯৯৯ নম্বরে ফোন করিয়া শত-সহস্র মানুষ প্রতিদিন পুলিশের সেবা লইয়া থাকে। ইহা বাস্তবতা; কিন্তু একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিভিন্ন দুর্নীতি অনিয়মের ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীল মহল হইতেই প্রথমে মুখ খোলা হয়। অতঃপর কিছু সংবাদপত্রে আরো কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি অনিয়মের চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে মাত্র। আমরা উদাহরণস্বরূপ বলিতে পারি, সর্বশেষ নির্বাচনের সময় কোনো কোনো এলাকার লোকজন দেখিয়াছে, এই পুলিশেরই কোনো কোনো কর্মকর্তা কোনো কোনো প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি অবতীর্ণ হইয়াছিলেন ভোট জালিয়াতির সহায়কশক্তি হিসাবে। ইহা কি আইনবিরোধী কাজ নহে? কাক নাকি চোখ বন্ধ করিয়া খায় বা কোনো কিছু লুকাইয়া রাখে। কিছু কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ নিজেদের কাকের মতো চালাক মনে করেন। তাহারা চক্ষু মুদিয়া অনিয়ম-দুর্নীতি করেন আর মনে করেন, কেহ দেখিতেছে না; কিন্তু একজন তো অবশ্যই দেখিতেছেন। তিনি মহান আল্লাহ।

এখন তো কেবল অভিযোগ উঠিতেছে। ইহার পর কী হইবে? ধাক্কাইয়া ধাক্কাইয়া যাহাদের চরম পর্যায়ে লইয়া যাওয়া হইতেছে, সকল দিক দিয়া কোণঠাসা করা হইতেছে, একপর্যায়ে আসিয়া তাহারা মনে করিতে পারেন—‘যাহা থাকে কপালে’ তাহাই হইবে, এই বার রুখিয়া দাঁড়াইতেই হইবে। কথা হইল, মানুষকে এই পর্যায়ে কেন লইয়া যাওয়া হইতেছে? মনে রাখিতে হইবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেই সকল রাজনীতিক কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকেন, তাহাদের স্ব স্ব পদ ও দায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকা উচিত। আর যদি কাহারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, তবে সেই অভিযোগ কেবল সংশ্লিষ্ট ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধেই। তাহা কখনই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নহে।