যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা উত্তরণের সাঁকো তৈরি করিবে কে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ধসিয়া পড়িল, তখন কমিউনিজমের পতনে আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলিয়াছিল অনেকে। ইহাকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ‘অবিস্মরণীয় ও চূড়ান্ত বিজয়’ বলিয়া অবিহিত করিয়াছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ন্যায় অনেক প্রথিতযশা রাজনীতি বিশ্লেষক। ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’ নামক বই লিখিয়া চারিদিকে রীতিমতো হইচই ফেলিয়া দিয়েছিলেন পণ্ডিত ফুকুয়ামা। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, যুক্তিবিদ্যার ব্যাসিক ফর্মুলা পর্যন্ত পাত্তা পায় নাই তত্কালীন বিশ্বনেতা ও বিশ্বপণ্ডিতদের নিকট! আগুন নিভানোর পরও যদি ধোঁয়া উঠিতে দেখা যায়, তাহার সহজ অর্থ—সেইখানে আগুন আছে কিংবা ধোঁয়া হইতে অকস্মাত্ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটিতে পারে। জানিয়া-বুঝিয়া হউক কিংবা অজ্ঞানতাবশত—যুক্তিশাস্ত্রের এই সহজপাঠ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হইয়াছে সোভিয়েত জমানা-পরবর্তী বিশ্বে। কারণ, এই মহাসাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়াছিল বটে; কিন্তু যুদ্ধের আগুন তখনো নিভে নাই। স্নায়ুযুদ্ধের যুগে কিংবা ইহার পরবর্তী সময়ে কেউ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করিতে পারে নাই যে, যুদ্ধের ছাই হইতে নূতন করিয়া অগ্নস্ফুিলিঙ্গ ছড়াইবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে! বিভিন্ন পক্ষ ইহা বেশ ভালোমতোই বুঝিতে পারিল, যখন এক রক্তাক্ত যুদ্ধে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থা উলটপালট হওয়ার উপক্রম হইল। রণধ্বনি তো বাজিলই এবং তাহা বাজিল খোদ সুরক্ষিত ইউরোপের মাটিতেই। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রভাতে শুরু হওয়া সেই ‘ইউক্রেন যুদ্ধ’ এখনো থামে নাই। বিশ্বব্যবস্থাকে কার্যত পঙ্গু করিয়া দিয়াছে এই মহাসংঘাত।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর অনেকের ধারণা ছিল, ইউরোপে হয়তো আর কোনো যুদ্ধের ঘটনা ঘটিবে না। বিশ্ব জুড়িয়া উদার গণতন্ত্র এবং মুক্ত ও উদার অর্থনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে; কিন্তু এই হিসাব কতটা নির্ভুল ছিল, তাহা আজ কোটি টাকার প্রশ্ন। ইহার চাইতেও বড় প্রশ্ন, বিশ্বে এখন যেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রাধান্য, তাহাই-বা কত কাল বজায় থাকিবে? এই ধরনের নানা প্রশ্ন বর্তমানে সামনে আসিতেছে প্রসঙ্গতই। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেইরূপ উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে, নূতন নূতন সংঘাত-সংঘর্ষ মাথাচাড়া দিতেছে, তাহাতে কখন কোন দেশ উত্তাল হইয়া উঠে, কাহার সহিত কাহার বাহাস এবং তাহা হইতে যুদ্ধ লাগিয়া যায়, তাহার হদিস রাখাই দুষ্কর! অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ যেন খুবই স্বাভাবিক বিষয়! অথচ যুদ্ধের কারণে যে বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা আরো প্রকট ও প্রলম্বিত হইতেছে। যুদ্ধ না করিয়াও যুদ্ধের অভিঘাতে দগ্ধ উন্নয়নশীল বিশ্বের অবস্থাই-বা কোন পর্যায়ে গিয়া দাঁড়াইবে? আবার এহেন অবস্থার উত্তরণ কীভাবে ঘটিবে, তাহার সন্ধানও মিলিতেছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ কাঁধে লইয়া বিশ্ব যখন সংকটের সাঁকো পার হইতেছে, সেই সময়ে নূতন করিয়া অস্থির হইয়া উঠিল মধ্যপ্রাচ্য। রাজনৈতিক ছকে পড়িয়া এই অঞ্চল এমনভাবে দুলিতেছে যে, না জানি—কতগুলি দেশ এই যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়া শেষ হয়!

এই বত্সর এমনিতেই বিশ্বব্যাপী নির্বাচনের বত্সর। কতিপয় দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে ইতিমধ্যে। অনেক দেশে নির্বাচন আসিতেছে। বত্সরের শেষে ভোট হইবে যুক্তরাষ্ট্রে—বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে দৃষ্টি রাখিতেছে মার্কিন মুলুকের উপর। সেইখানকার অবস্থাও কি ভালো? বাকি উন্নত রাষ্ট্রগুলির অবস্থাই-বা কী? সেই সকল দেশও কি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল? উন্নয়নশীল দেশগুলিতে লক্ষ করা যাইতেছে চরম রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি এবং ইহার ফলে ঐ সকল দেশের জনগণ ক্রমাগত ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মহাসাগরে নিমজ্জিত হইতেছে। এই সকল বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বাক্যই বলা যায়—লক্ষণ খুব সুবিধার নহে। বস্তুত, সমগ্র বিশ্বের সামনে যেন কোনোই সুসংবাদ নাই, আছে কেবল ‘টেনশন’! বিশ্বনেতৃত্ব না দেখাইতে পারিতেছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, না বসিতেছে সমঝোতার টেবিলে। নিজেদের কথা তো বটেই, ভুক্তভোগী উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের কথা ভাবিয়া হইলেও তাহাদের শান্তির পথে আসা উচিত। প্রকৃতি সহিবে না যুদ্ধের এই নিষ্ঠুর খেলা!