সেনা অভ্যুত্থানে সুদানের দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকমাস ধরে সেনাবাহিনী বনাম গণবাহিনী অর্থাত্ সাধারণ আন্দোলনকারীদের মধ্যে চরম বিরোধ চলছিল। আন্দোলনকারীরা আবারও একজন সেনানায়কের অধিনায়কত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করছিল। আর সেনাবাহিনী তাদের গতানুগতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল অবলম্বন করছিল। এই বিরোধে সাধারণ জনগণ প্রাণ হারাচ্ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সুদানের খারাপ অর্থনীতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল। গত মে মাসে সংকট নিরসনে দুদফা বৈঠকে বসলেও বিরোধের অবসান হয়নি। এরপর আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ৩ জুলাই উভয় পক্ষ বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ বৈঠকের পর সেনাবাহিনী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে সক্ষম হন। এই অর্জিত ঐকমত্য অনুযায়ী নতুন সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দুই পক্ষ মিলেমিশে দেশ চালাবে। চূড়ান্ত ঐকমত্যের এই ঘোষণা অনুযায়ী তিন বছর বা তার বেশি সময় দেশ চালানোর জন্য একটি সার্বভৌম কাউন্সিল গঠন করতে রাজি হয়েছে দুই পক্ষ। পালাক্রমে ঐ কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবে সেনাবাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিত্বশীল বেসামরিক প্রশাসন। সুদানের সেনাবাহিনীর পক্ষে জেনারেল মোহাম্মাদ হামদান দাগালো বলেন, ‘আমরা পুনরায় আশ্বাস দিতে চাই, এই চুক্তিতে সবাই যুক্ত; কেউ বাদ যায়নি।’ আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত মোহাম্মাদ এল হাসেন লেবাত দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। এর আগে ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট নিজে এসে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালান।
প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির গতবছরের শেষদিকে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। বশির সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় বিক্ষোভের পর বিক্ষোভ চলতে থাকায় অচল অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়। অর্থনৈতিক খাতে নানান ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনগণ এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়। তারা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির একতরফাভাবে গত ৩০ বছর ধরে সুদানের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। এ ধরনের শাসকরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দেশ শাসন করেন। সেনাবাহিনী প্রধান যখন শাসকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন তারা বন্দুকের নল ঘুরিয়ে ধরে। সুদানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিগত ৬ এপ্রিল আন্দোলনের মাত্রা তীব্রতর হয়ে ওঠে। সেদিন তারা সেনা সদর দপ্তরের সম্মুখে অবস্থিত ভবন দখল করে নেয়। প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তারা সেনাবাহিনীর ওপর চাপ প্রয়োগ করে। ১১ এপ্রিল সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে পদত্যাগে বাধ্য করে। ১১ সদস্যের একটি সেনা কাউন্সিল দেশ শাসনের দায়িত্ব নেয়। তারা সারা দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু সেনা নেতৃত্বে গণবিক্ষোভকারীরা অনাস্থা জ্ঞাপন করে। একদিকে সেনাবাহিনীর অনৈক্য এবং অপরদিকে নানা ধরনের বেসামরিক বাহিনী শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। অপরদিকে গত রমজানের মধ্যেও বিক্ষোভকারীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখায় সেনাবাহিনীর পক্ষে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ৩ জুন সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নামে আগের স্টাইলেই গুলিবর্ষণ করে। কমপক্ষে ৩০ জন এতে প্রাণ হারায়। দৃশ্যত পাশ্চাত্যের ইশারা-ইঙ্গিতে অনুষ্ঠিত ঐ অভ্যুত্থানের পর রক্তক্ষয়ের ঘটনা তাদেরকে বিব্রত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাণহানিকে নির্মম আক্রমণ বলে অভিহিত করে। বৃটেন হত্যার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করে। অস্থায়ী সেনাশাসন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে পদক্ষেপের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করলেও তা কেউ মেনে নেয়নি। বিক্ষোভরত জনগণের মাঝে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি বা আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়নি। বরং এখানে পৃথিবীর অন্যত্র সংঘটিত আন্দোলনকারীদের থেকে ভিন্নতর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। সুদানের পেশাজীবীদের একটি সংগঠন এসপিএ এর নেতৃত্বে এ আন্দোলন সংঘটিত হয়। এই পেশাজীবী সমিতিতে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আইনজীবীরা রয়েছেন। এতে সর্বস্তরের জনসাধারণ অংশগ্রহণ করছে। এদের অধিকাংশই তরুণ যুবা বলে বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে। সুদানের নারীরাও আন্দোলনে শামিল হয়েছে। সম্মুখ ভাগেই তাদের দেখা যাচ্ছে। কান্দাকা নামে একজন মহিলা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি তার সাহস ও অব্যাহত শ্লোগানের জন্য ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন। তিনি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা আন্দোলনের কৌশল হিসাবে সেনা সদর প্রাঙ্গণকেই বেছে নিয়েছেন। সেখানে তারা বেসামরিক সরকার গঠনের জন্য অব্যাহতভাবে অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত এ ধরনের বিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী ক্ষমতাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করলেও অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে সমঝোতায় রাজি হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। মজার ব্যাপার সেনাবাহিনী নির্বাচনের জন্য ৯ মাস সময় দাবি করেছে। অথচ বিক্ষোভকারীরা তিন বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা বলছে। তারা অবশ্য যুক্তি দেখাচ্ছে যে, বিভিন্ন পর্যায়ে ওমর আল বশিরের রাজনৈতিক সংযোগকে অকার্যকর করতে সময় প্রয়োজন। আর তা না হলে নির্বাচনটি অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। উপনীত সমঝোতা অনুযায়ী সমাগত সরকারের তিনটি প্রাতিষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এতে থাকবে (১) একটি সার্বভৌম পরিষদ (২) একটি মন্ত্রিসভা এবং (৩) একটি জাতীয় সংসদ। তারা আরো সম্মত হয়েছে যে, গঠিত মন্ত্রিসভায় সকলেই অরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব স্থান পাবেন। সেনাবাহিনীর হাতে হতাহত লোকদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠিত হবে। আফ্রিকান ইউনিয়ন কর্তৃক চুক্তি ঘোষণার পরপর বিক্ষোভরত আন্দোলনকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। আন্দোলন স্থগিত হয়। রাজপথ উন্মুক্ত হয়। আন্দোলন সফল হওয়ার পর জানা যায় যে, সাম্প্রতিক সময়ে সাতজন নিহত এবং ১৮১ জন আহত হয়েছেন। সংলাপ সফল হওয়ার ব্যাপারে আফ্রিকান ইউনিয়নের বিশেষ ভূমিকা এবং ইথিওপিয়ার নেতৃত্বের সক্ষমতা কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে প্রবীণ রাজনীতিবিদ সিদ্দিক ইউসুফ একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের জন্য চুক্তিকে প্রথম পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অবশেষে তারা সফল হবেন। সমঝোতার সময়কাল অতিক্রান্ত হলে তিন বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর একজন রাজনৈতিক নেতা উমর আল দিগের চুক্তিকে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা বলে মন্তব্য করেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জেনারেল মোহাম্মাদ হামদান দাগালো আশ্বস্ত করেন যে, চুক্তিটি হবে সামগ্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। সকল মত ও পক্ষের প্রতিনিধিত্ব এখানে থাকবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
সম্পাদিত চুক্তির ব্যাপারে বিভিন্ন মহল মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আন্দোলনকারীদের একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা লিনা আল শেখ বলেন, আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি দাওয়ার ব্যাপারে অনমনীয় ছিল। মধ্যস্থতাকারী নেতৃবৃন্দের অনুরোধে তারা অনেক ছাড় দিয়েছে। বিগত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত সেনানায়কদের সভায় নির্যাতনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে ব্যাপারে সকলকে আশ্বস্ত করা হয়। সামরিক বাহিনীর চরিত্র অনুযায়ী অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় ক্ষমতা সংহত করে। তাই উপনীত চুক্তির ভবিষ্যত্ নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিবিসির সিনিয়র আফ্রিকান সংবাদদাতা এনি সয় অজানা আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী মূলত ছাড় দিতে অনিচ্ছুক ছিল। আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক চাপে তারা সম্মত হয়। সেনাবাহিনীর শক্ত অংশ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়