টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ভারী বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের উজানো পানি যুক্ত হলে গতকাল সোমবার নগরীর অনেক এলাকা কোমরপানিতে তলিয়ে যায়। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, নাসিরাবাদ সিডিএ অ্যাভেনিউর বিভিন্ন অংশ, হালিশহর আবাসিকের বিভিন্ন সড়ক, পাঁচলাইশ, চকবাজার, ডিসি রোড, বাকলিয়া, মুরাদপুর, শুলকবহর, চান্দগাঁও, মেহেদীবাগ, প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকা, জিইসি মোড়, গুলজার মোড়, খাজা রোডসহ নগরীর প্রায় ৫০টি নিচু এলাকার সড়ক, ভবনের নিচতলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসমূহ হাঁটু থেকে কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি উজিয়ে আসায় বহু দোকানপাট, আড়তে ও রাস্তাঘাটে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি ও আশপাশের এলাকায়ও অনুরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খোলা পণ্যের খালাস-লাইটারিং দুই দিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে জানান বন্দর ও লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সূত্রগুলো। নগরীর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের বহদ্দরহাটমুখী অংশে দিনভর ৬ শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও আরাকান সড়ক ও বাকলিয়ার বিভিন্ন সড়কে পানি ওঠায় সেই সব স্থানে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে কোমরপানিতে তলিয়ে যাওয়া বিশ্বরোডের মুরাদপুর অংশ ভয়াবহ যানজটে নিশ্চল হয়ে গেলে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারেও এর প্রভাব পড়ে।
নগরীর রাস্তায় পানি ও গর্তের কারণে বাস-টেম্পো চলাচল কম থাকায় চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা পড়েছে অশেষ কষ্টে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস থেকে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত রয়েছে। আবহাওয়া অফিস গতকাল সকাল ১০টায় নতুন করে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার সতর্কতা সংকেত দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে গতকাল চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দু-একটি ফ্লাইট চলাচলে বিলম্ব ঘটে। তবে সার্বিকভাবে এই বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে এয়ারপোর্ট ম্যানেজার উইং কমান্ডার সারোয়ার-ই-জামান ইত্তেফাককে জানান।ওয়াসার পাইপ বসানোর জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বিনষ্ট হওয়া বিভিন্ন সড়কের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বৃষ্টির পানিতে। বর্ষাতেই কেন এই খোঁড়াখুঁড়ি—এই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম থেকে। গতকাল চট্টগ্রাম ওয়াসা ভবনের নিচতলায়ও পানি ঢুকে যায়। এতে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থার। সেখানকার কর্মকর্তারা জানান, তারা ওয়াসা ভবন থেকে পানি সরাতে পাম্প ব্যবহার করছেন।
চট্টগ্রামের নাগরিক, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, প্রতি বছর বর্ষায় ২০০ মিলিমিটারেরও কম বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম মহানগরী যেভাবে ভয়াবহ নিমজ্জনের শিকার হচ্ছে, এর দায় সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কেউই এড়াতে পারে না। সেই সঙ্গে দীর্ঘ শুকনো মৌসুম পেছনে ফেলে পাইপ বসানোর জন্য নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় এই বর্ষা মৌসুমেই ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িকে অবিবেচনাপ্রসূত বলেও উল্লেখ করেছেন ঐ সব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন আজ মঙ্গলবার বিকালে ইংল্যান্ড সফর শেষে দেশে ফিরছেন। তবে পরিস্থিতি মেয়র মহোদয়ের নির্দেশনাতেই মোকাবিলা করা হচ্ছে। ছোটো নালাগুলো সচল রাখার কাজ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে চলছে। তবে এক বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে বড়ো খাল ও সেকেন্ডারি নালাসমূহের পানির প্রবাহ ঠিক রাখার দায়িত্ব সিডিএর ওপর রয়েছে। কর্মকর্তাটি বলেন, যে কটি স্লুুইসগেট বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, বর্ষায় তো বৃষ্টি হবেই। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরী মাত্র ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই যেভাবে ডুবছে, তা গত ৩০ থেকে ৩৫ বছরের অনিয়ম, খাল-নালা ধ্বংস, জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেই প্রকৃতির প্রতিশোধ। সরকার এই কষ্ট লাঘবে যে মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে, তার সুফল এখনই মিলবে না। হয়তো এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েক বছর।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, প্রবল বর্ষণে নগরীর ফ্লাইওভারের ওপর পানি জমা এখন নতুন এক বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সিডিএ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এক পত্র মারফত জানিয়েছে যে তারা ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না।
জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বসবাসকারীদের সরাতে চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রশাসন দুর্যোগ মোকাবিলায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে এবং গতকালও আরো ৩৬টি পরিবারকে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে বলে প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়। চট্টগ্রামে গতকাল বিকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ১৮৫ মিলিমিটারেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।্র