দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমেরিকা চেয়েছিল যুদ্ধকালীন মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে। বিশেষ করে চীনকে নিজেদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক মিত্র বানাতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন। এ কারণে ১৯৪৫ সালে চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আমেরিকা। চীনের কমিউনিস্ট এবং জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বিভেদকে প্রশমন করে সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান বিশ্বের অন্যতম সমর নায়ক, কূটনীতিতে কিংবদন্তি জেনারেল জর্জ মার্শালকে পাঠান চীনে।
ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলান চীনের তত্কালীন পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, চীনে তখন জাতীয়তাবাদী নেতা চাং কাই শেকের সরকার। তিনি পুরো চীনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অন্যদিকে, কমিউনিস্টরা তখন উত্তর-পশ্চিমের ইউনানে বসে চাং কাই শেককে চ্যালেঞ্জ করছিল। চীনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জেনারেল মার্শালকে পাঠান। ট্রুম্যানের প্রত্যাশা ছিল মার্শালের প্রচেষ্টায় চীনের কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে যে বিভক্তির রেখা তৈরি করে চলেছে তা যেন শেষ করা যায়। চীনে যেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুবা সোভিয়েতরা চীনের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কমিউনিস্টদের শক্তিশালী করে তুলবে।
তত্কালীণ মার্কিন সেনা কর্মকর্তা হেনরি বায়রেডকে নিয়ে ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে বেইজিং পৌঁছান জেনারেল মার্শাল। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীনা কমিউনিস্ট সেনাবাহিনীকে ভেঙে দেওয়া। এ কারণেই তারা চীনা কমিউনিস্টদের নেতৃত্ব দেওয়া মাও জেদংকে বোঝানোর প্রচেষ্টা চালান। জেনারেল মার্শাল দুই পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করলেন। তাদের কাছে জানতে চাইলেন শান্তির জন্য তারা কী চান।
এভাবে তিনি জাতীয়তাবাদী এবং কমিউনিস্টদের মধ্যের চলমান লড়াই বন্ধ করতে রাজি করালেন। মার্শাল দুই পক্ষের মূল নেতৃত্বের সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেন। সবার ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে জেনারেল মার্শাল জাতীয়তাবাদী এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে একটি বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরি করতে সম্ভব হন। গৃহযুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা দিতে মাও জেদাংয়ের সহযোগী জেনারেল মার্শল এবং জাতীয়তাবাদের পক্ষের একজন প্রতিনিধি একসাথে চীন সফরের বের হন। কমিউনিস্ট এবং জাতীয়তাবাদীদের সমন্বয়ে চীনে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গড়ে তোলাই ছিল সেই সফরের লক্ষ্য। ইউনানে ২৪ ঘণ্টা অবস্থানকালে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা মাও জেদংয়ের সঙ্গেও মার্শাল বিস্তারিত আলোচনা করেন। কমিউনিস্টরা কীভাবে জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে থাকা সরকারে যোগ দেবে সে বিষয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আমেরিকা সফরে বদলে যায় পুরো প্রেক্ষপট। চার্চিল আমেরিকাতে গিয়ে বলেন, ইউরোপে কমিউনিস্টরা লোহার পর্দা ফেলছে। এ ধরনের বক্তব্যে সন্দিহান হয়ে পড়তে শুরু করে মাও জেদং এবং তার সঙ্গীরা। এই সন্দেহের থেকেই জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার রাস্তা থেকে সরে যায় কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্টরা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে লড়াইয়ে তারা জিতবে। ফলে চীনে গৃহযুদ্ধ বন্ধের চুক্তি দ্রুত ভেঙে পড়ল। এক সময়ে হতাশ হয়ে দেশে ফিরে যান জেনারেল মার্শাল। তার দুই বছর পর চাং কাই শেককে হারিয়ে পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কমিউনিস্টরা। সেই সাথে শেষ হয়ে যায় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার স্বপ্নও।—বিবিসি