কথায় বলে কথা কম, কাজ বেশি। কিন্তু এই কথা বলা যত সহজ, করা তত কঠিন। যাহারা বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান, তাহারা জানেন কীভাবে জিহ্বাকে সামলাইয়া চলিতে হয়। কথায় নহে, কাজেই মানুষ বড় হয়। ভাষণে নহে, অ্যাকশনেই দক্ষ মানুষের পরিচয়। এই জন্য কবি কুসুমকুমারী দাশ তাহার 'আদর্শ ছেলে' কবিতায় লিখিয়াছেন, 'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে'।
আমাদের অবশ্যই কথার চাইতে কাজে অধিক দক্ষতা প্রদর্শন করিতে হইবে। বলিলেও কম কথা বলিতে হইবে, যথার্থ কথা বলিতে হইবে। অনেক সময় ছোট্ট ছোট্ট কথায় অনেক বলা হইয়া যায়। তাহাই বরং উত্তম। আমাদের চারিপার্শ্বে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীবনযাপনে এমন ছোট্ট ছোট্ট কথা, বিষয় বা সাইন-সিম্বল রহিয়াছে, যাহা বড় বিষয়কে তুলিয়া ধরে, যাহা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। 'আকাশ' শব্দটি যতই ছোট্ট হউক, তাহার বিশালতা কল্পনার চাইতেও বড়। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই কথা কম বলিয়া বেশি বেশি কাজ করিয়া যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মৃত্যুর পরেও মানুষ বাঁচিয়া থাকে তাহার কাজের মাধ্যমে। এই জন্য কথার মানুষ আর কাজের মানুষ কখনো এক হইতে পারে না।
আমাদের দেশে অনেকে কম কথা বলেন, কাজ বেশি করেন। কেহ কথা বেশি বলেন, কাজ কম করেন। অনেকে আছেন যতটুকু বলেন, ততটুকু করেন। কেহ আবার না করিয়াও বলেন। আর কেহ না বলিয়াও করেন। এই কথা ও কাজের ক্ষেত্রে কে ভালো কে মন্দ, তাহা সবাই জানেন। তাহার পরেও একটা স্ট্যান্ডার্ড বা মান বোধহয় আমাদের চারিপার্শ্ব হইতেই বোঝা যায়। আমরা মানি আর না মানি, কম কথা বলা আসলে মানুষের উত্তম গুণ। কেননা বেশি কথা বলিলে বিপদ বেশি হয়। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। পক্ষান্তরে চিন্তাভাবনা করিয়া কথা বলিলে পদস্খলন কম হয়। এই জন্য ইসলামের নির্দেশনা হইল-'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে নতুবা চুপ থাকে (বুখারি ও মুসলিম)। অনেক সময় চুপ থাকিবার কারণে পরবর্তী সময়ে লজ্জায় পড়িতে হয় না। এই জন্য বলা হয়: যে চুপ থাকে, সে পরিত্রাণ পায় (তিরমিজি)।
কেননা কথা বুলেটের মতো। একবার মুখ হইতে বাহির হইয়া গেলে তাহা আর ফিরাইয়া আনা যায় না। অনেক সময় কথার পরিণতি ও ফলাফল হয় বিপজ্জনক। এমনকি ইহা একসময় জাতীয় সংকটের রূপ পরিগ্রহ করিতে পারে। এই জন্য মানুষের অঙ্গপ্রতঙ্গের মধ্যে হস্ত ও জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ সবচাইতে জরুরি। বিশেষ করিয়া, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই জন্য মহানবি (স.) বলিয়াছেন: যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান) সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাহার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। (বুখারি)
অনেক সময় হাতের আঘাতের চাইতে কথার আঘাত মারাত্মক ও কষ্টদায়ক। অতএব, অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা পরিহার করিয়া চলিতে হইবে। ভালো কথা বলিতে হইবে নতুবা চুপ থাকিতে হইবে। কথার চাইতে কাজের মূল্য বেশি দিতে হইবে। ইহাতেই আমাদের কল্যাণ ও সম্মান নিহিত। অনেক সময় দেশ ও জাতির জন্য এমন কঠিন মুহূর্ত আসে, যখন অতি কথা সকলের জন্য খারাপ ফল বহিয়া আনে। এই সময় আমাদের কথা ও কাজে অবশ্যই দায়িত্বশীল হইতে হইবে। কথা কম কাজ বেশি-এই কথা শুধু মুখে বলিলেই চলিবে না, ইহা যেন কথার কথা না হইয়া থাকে। বরং বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটাইতে হইবে। আমাদের দেশেও এমন অনেক বিচক্ষণ অভিজ্ঞ ব্যক্তি রহিয়াছেন, যাহারা গণমাধ্যমে তেমন আলোচিত নহেন। কিন্তু তাহারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাহারা কথা বলেন কম, কাজ করেন বেশি। তাহাদের লইয়া কদাচিৎ বিতর্ক দেখা যায়। তাহারা বাগাড়ম্বর করেন না, তাই তাহাদের জীবনে বিড়ম্বনাও কম। আমরা কি তাহাদের অনুসরণ করিতে পারি না?