রাষ্ট্র হইতেছে সর্ববৃহৎ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে আধুনিক কালে একটি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হইল ক্রমশ কল্যাণকর রাষ্ট্র হইয়া উঠা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টমাস গ্রিনের একটি উক্তি কল্যাণকর রাষ্ট্র হইয়া উঠিবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলিয়াছেন- 'শক্তি নহে ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ভিত্তি'। মানুষ মূলত নিজেই প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সৃষ্টি করিয়াছে। রাষ্ট্র নাগরিকগণের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা দিয়া তাহার ইতিবাচক ভূমিকা রাখিতে পারে। রাষ্ট্রের দুই প্রকার কার্যাবলির মধ্যে রহিয়াছে অপরিহার্য ও ঐচ্ছিক কার্যাবলি। অপরিহার্য কার্যাবলির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাহার অস্তিত্ব রক্ষা ও নাগরিকগণের সার্বিক জীবনের জন্য যাহা যাহা করিতে হয়, তাহা করিয়া থাকে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের ঐচ্ছিক কাজের মধ্যে রহিয়াছে কল্যাণমূলক ভূমিকা। তবে আধুনিক রাষ্ট্রগুলি কল্যাণমূলক কার্যাবলিকেও অপরিহার্য হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে। এই জন্য বর্তমান যুগে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কাজগুলি তত্ত্বগতভাবে ঐচ্ছিক হইলেও বাস্তবে তাহা অপরিহার্য কাজে পরিণত হইয়াছে। রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশও চেষ্টা করিতেছে ক্রমশ কল্যাণমূলক কার্যাবলিকে শানিত করিতে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, গত ২০ মে 'বাংলাদেশ দ্য কনভেনশন অন অ্যাবোলিশিং দ্য রিকোয়ারমেন্ট অব লিগ্যালাইজেশন অব ফরেন পাবলিক ডকুমেন্ট' বা এপোস্টিল কনভেনশন-১৯৬১-এ যুক্ত হইবার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পাশ করা হয়। উহা ছিল আমাদের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ উহা কার্যকরের ভিতর দিয়া আমাদের দেশের শিক্ষার্থী, অভিবাসী, কর্মী, পারিবারিক পুনর্মিলনপ্রত্যাশীসহ বিদেশগামী সকলের যেই সকল প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট এই দেশে এবং বিদেশের দূতাবাসসহ নানান দপ্তরে সত্যায়নের প্রয়োজন হয়, সেই সকল ডকুমেন্ট শুধু এই দেশে সত্যায়ন করিলেই হইবে।
পৃথিবীর সকল দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে নাই । যাহাদের দূতাবাস নাই, এমন ৯০টি দেশের দূতাবাস রহিয়াছে ভারতের ভারতের দিল্লিতে দিসেইখান হইতে সত্যায়ন করিয়া আনিতে আবার ভারতের ভিসার প্রয়োজন হয়। সার্বিকভাবে অর্থ, সময়, পরিশ্রম ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। গত ২০ মে এই প্রস্তাব পাশের পর ইহা কার্যকর হইতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগিবে বলিয়া মনে করা হইতেছিল। কারণ এপোস্টিল কনভেনশনে যুক্ত হইতে ইহার ১২৬টি সদস্য রাষ্ট্রকে অবহিত করিতে হয়। অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার হইল, এই সকল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র ৭০ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। গত সোমবার 'বাংলাদেশ দ্য কনভেনশন অন অ্যাবোলিশিং দ্য রিকোয়ারমেন্ট অব লিগালাইজেশন অব ফরেন পাবলিক ডকুমেন্ট বা এপোস্টিল কনভেনশন- ১৯৬১'-তে যুক্ত হইয়াছে। ইহার ফলে দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন করা ডকুমেন্ট আর অন্য দেশে পুনরায় সত্যায়ন করিতে হইবে না। একদিকে অর্থের সাশ্রয় অন্যদিকে মানুষের দুর্ভোগ হ্রাসের এই দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা।
স্পষ্টতই এই কনভেনশনে যোগদান বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এখন হইতে ই-এপিপি বা ইলেকট্রনিক এপোস্টিল প্রোগ্রাম পদ্ধতিতে সত্যায়ন করিয়া ইলেকট্রনিক এপোস্টিল সার্টিফিকেট ইস্যু করা হইবে, যাহার সত্যতা ও সঠিকতা সার্টিফিকেটে বিদ্যমান কিউআর কোড দিয়াই বিশ্বের যে কোনো জায়গা হইতে যাচাই করা যাইবে। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশগামী ছাত্রছাত্রী এবং পেশাজীবীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও ভোগান্তি সম্পূর্ণ লাঘব হইবে।
রাষ্ট্রের এই ধরনের কল্যাণকর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকুক। ঔপনিবেশিক যুগ পার করিয়া জাতিসত্তাময় একটি রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের ইতিবাচক দিকটি বিকশিত হউক। পশ্চিমা বিশ্বের কল্যাণকর জাতি-রাষ্ট্র গঠন ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, ইহার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মপরিচয়ের ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্ন। গত অর্ধশতকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলিতে একসময় বড় একটা রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা দিয়াছিল নূতন নামকরণের মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে সমাধানের একটি পথ হিসাবে গ্রহণ করা। সুতরাং কল্যাণকর পদক্ষেপের পাশাপাশি আমাদের আত্মপরিচয়ও সমুজ্জ্বল রাখিতে হইবে। সভ্য, শিক্ষিত, মানবিক জাতি হিসাবে নিজেদের গড়িয়া তুলিতে হইবে।