শতরঞ্জি পল্লী

সুতার বুননে যেখানে আঁকা হয় জীবনের ছবি

শতরঞ্জি শব্দটির সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে খানিকটা মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে থাকেন, সম্রাট আকবরের দরবারে শতরঞ্জি বা পাশা খেলার সময় মেঝেতে যে বস্তুটি বিছানো হতো, তা থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছে শতরঞ্জি। কেউ বা আবার মনে করেন, শব্দটি এসেছে ‘শত রঙের বাহার’ থেকে। যদিও বা শতরঞ্জি তৈরিতে শত রঙের বদলে ব্যবহার করা হয় গুটিকয়েক নির্দিষ্ট রং। কিন্তু রঙের সংখ্যার স্বল্পতায় কী-ই বা আসে যায়, যেখানে শিল্পীরা তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুতার বুননে প্রতিনিয়ত এঁকে চলেছেন জীবনের ছবি!

রংপুর জেলার পশ্চিমে ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত নিরিবিলি একটি গ্রাম নিসবেতগঞ্জ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দী কিংবা তারও আগে এই গ্রামে শতরঞ্জির প্রচলন ছিল, কালের বিবর্তনে যা মুছে না গিয়ে এখনো সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষীস্বরুপ।

শতরঞ্জি

অষ্টাদশ শতকের চল্লিশের দশকের কথা। সেসময় নিসবেতগঞ্জের নাম ছিল পীরপুর। তৎকালীন রংপুর জেলার কালেক্টর ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক মি. নিসবেত। তিনি শতরঞ্জির শৈল্পিক রুপ ও নান্দনিকতা দেখে এতোটাই মুগ্ধ হন যে শতরঞ্জির প্রচার ও প্রসারে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার হাত ধরেই শতরঞ্জি শিল্প এগিয়ে যায় অনেকখানি পথ। তার অসামান্য এই অবদানের জন্য পরবর্তীতে এই গ্রামটির নামকরণ করা হয় নিসবেতগঞ্জ, শতরঞ্জি শিল্পের জন্য যার পরিচয় এখন বিশ্বব্যাপী।

শতরঞ্জি

বুনন শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনতম বুনন শিল্প হল এই শতরঞ্জি। যে বৈশিষ্ট্যটি শতরঞ্জিকে অনন্যতা দান করেছে তা হল এটি তৈরিতে নেই কোন যন্ত্রের ব্যবহার। সুতা টানা দেওয়া বাঁশের ফ্রেমে হাত দিয়েই বোনা হয় শতরঞ্জি। শিল্পীরা সুতার বুননে আঁকেন বাঙালি জীবনের ছবি। নকশা হিসেবে স্থান পায় চিরায়ত বাঙালি জীবন ও বাঙালিয়ানার সঙ্গে মিশে থাকা বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের চিত্র। কখনো বা পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্র ও দেব-দেবীর ছবিও স্থান পায় শতরঞ্জিতে। শতরঞ্জি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস, শিল্পীরা সুতার বুননে যেখানে এঁকে চলেছেন আমাদের জীবনের গল্প, আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্প।

শতরঞ্জি

একটা সময় রাজা-বাদশা ও বিত্তবানদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই শতরঞ্জি। সভা কিংবা মজলিশে বসার আসন, বিছানা এমনকি দেয়াল মাদুর হিসেবে এর ব্যবহার ছিল সর্বাধিক। তবে কালের পরিক্রমায় বিন্দুমাত্র কমে যায়নি শতরঞ্জির আবেদন। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে বললে ভুল হবে না। এখনো অনেক বাসা-বাড়িতেই শখের বশে শতরঞ্জির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। তবে এখনকার শতরঞ্জি শুধুমাত্র আসন, বিছানা কিংবা দেয়াল মাদুরেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে টেবিল ম্যাট, ব্যাগ, বাসা-বাড়ির সাজানোর উপকরণসহ বিভিন্ন নান্দনিক পণ্যে।

দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। বহির্বিশ্বে নিয়মিতই শতরঞ্জির রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। শুধু তাই নয়, নিসবেতগঞ্জের নারীরাও এখন শতরঞ্জি শিল্পের হাত ধরে স্বাবলম্বী।