বন্ড সুবিধার অপব্যবহার

দেশে সর্বক্ষেত্রে নিয়মের চাইতে অনিয়মের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইতেছে। সততার সঙ্গে ব্যবসায়-বাণিজ্য চালাইয়া যাওয়া ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের চাইতে অসত্ উপায় অবলম্বনকারীরাই মুনাফার মুখ দেখিতেছে বেশি। ফলে নিয়ম মানিয়া ব্যবসায় করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গুটাইয়া যাইতে বাধ্য হইতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এহেন দুষ্কর্মে টুলস হিসাবে ব্যবহূত হইতেছেন কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁহারা সরকারের প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ফাঁকফোকর দিয়া একশ্রেণির ব্যবসায়ীকে অবৈধ আয়ের পথ করিয়া দিতেছেন, সেই সঙ্গে নিজেরা লাভবান হইতেছেন। সরকারের মহতী উদ্যোগকে কলুষিত করিবার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বন্ড সুবিধা। নিঃসন্দেহে ইহা সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিবার জন্য, রপ্তানি বাণিজ্যকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করিবার নিমিত্তে সরকার বন্ড সুবিধার মাধ্যমে রপ্তানিমুখী পণ্যের কাঁচামালের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়া থাকে। কিন্তু বহু ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করিয়া স্থানীয় বাজারে বিক্রয় করিতেছে। ফলে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ছাড়িয়া দিতেছে রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারতার স্বার্থে। কিন্তু এহেন সুবিধা গ্রহণ করিয়া একপেশে মুনাফা লাভের উত্সব চলিতেছে। সেই সঙ্গে চলিতেছে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিং। অর্থাত্ পণ্যের মূল্য কমবেশি দেখাইবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। পক্ষান্তরে অল্পকিছু ব্যবসায়ী, যাঁহারা সততার সহিত কাজটি করিতে চাহেন, তাঁহারা পড়িয়াছেন বিপাকে।

নিয়ম হইল, বন্ড সুবিধায় বিদেশ হইতে কাঁচামাল আনিলে তাহাতে শুল্ক ও কর দিতে হয় না। কিন্তু শর্ত থাকে, কাঁচামাল আনিয়া তাহা পুরোপুরি ব্যবহার করিয়া আবার রপ্তানি করিতে হইবে। ইহার জন্য নির্দিষ্ট সময়ও বাঁধিয়া দেওয়া থাকে। বন্দর দিয়া কী পরিমাণ কাঁচামাল আসিয়াছে তাহার হিসাব যেমন রখিবার কথা, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানের মাল কী পরিমাণ আসিয়াছে, কী পরিমাণ ওয়ারহাউসে রক্ষিত আছে এবং কী পরিমাণ ব্যবহূত হইয়াছে—তাহার হিসাবও মিলাইয়া দেখিবার কথা। কিন্তু যাঁহাদের দেখিবার কথা তাঁহারা নিজেরাই অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকিয়া গিয়াছেন। যদিও সম্প্রতি সরকার বন্ড সুবিধা অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকির ব্যাপারে খানিকটা তত্পর হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু এই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনিবার জন্য তাহা যথেষ্ট নয়। এই ব্যাপারে সরকারকে নীতিগতভাবে আরো দৃঢ় হইতে হইবে। কিছু প্রতিষ্ঠান রাঘব-বোয়ালদের মালিকানাধীন। তাহারা যদি ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায় তাহা হইলে কোনো অভিযান, কোনো তদারকি কাজে আসিবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। তাহাদের আরো শক্তিশালী করিতে হইবে এবং এনবিআর স্বয়ং যাহাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ চালাইয়া যায়, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। নচেত্ এইভাবে চলিতে থাকিলে কেবল সরকার রাজস্বই হারাইবে না, আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেরও সমূহ ক্ষতিসাধিত হইবে। যাঁহারা অপকর্ম চালাইয়া যাইতেছেন এবং এই অনিয়ম-অপকর্মে সহায়তা করিতেছেন, তাঁহাদের মনে রাখিতে হইবে, যে কোনো সময় জবাবদিহিতার খড়্গ তাহাদের ঘাড়ে আসিয়া পড়িতে পারে। এই রকমের অন্যায়-অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা সহ্যেরও একটা সীমা আছে।