জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ বাংলা চলচ্চিত্রের সবচাইতে বড়ো মাইলফলক। এই ছবির নাম জানে না—এমন কেহ নাই; কিন্তু বেদে সম্প্রদায়কে আমরা কতটা জানি? তাহাদের দুঃখ-কষ্ট, যাযাবর জীবনের অনিশ্চয়তা আমরা কতখানি অনুধাবন করিতে পারি? গত সোমবার ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় বেদে সম্প্রদায়ের নৌকাবহরের একটি আলোকচিত্র ছাপা হইয়াছে—যেইখানে দারুণভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে প্রকৃতির সহিত তাহাদের একাত্মতা; কিন্তু এই বেদে সম্প্রদায় এখন বিলুপ্তির পথে। ধ্বংসের মুখে তাহাদের চিরাচরিত জীবন-প্রণালি। বর্তমানে বেদেদের একটি বড়ো অংশ ঠিকানাবিহীন ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করিতেছে। জীবিকার সন্ধানে তাহারা খুঁজিয়া নিতেছে নানা পথ। অথচ হাজার বত্সর ধরিয়া বাংলা সংস্কৃতির একটি উপাদান হইয়া রহিয়াছে এই বেদে সম্প্রদায়। বিশেষ করিয়া ময়মনসিংহ গীতিকায় বেদে সম্প্রদায়ের উল্লেখ রহিয়াছে অসংখ্যবার।
বেদেরা এখনো যাযাবরের মতো ঘুরিয়া বেড়ায় এখানে-সেখানে। দেশে দেশে বা অঞ্চলভেদে তাহাদের একেক নাম, আর বাঁচিয়া থাকিবার জন্য বিচিত্রসব পেশা। নদীনির্ভর বাংলাদেশে বেদেদের বাহন তাই হইয়া উঠে নৌকা। নৌকায় সংসার আবার নৌকা লইয়াই ঘুরিয়া বেড়ানো দেশ-দেশান্তরে। প্রকৃতির মধ্যেই ইহারা জীবনের বৈচিত্র্যের সন্ধান খোঁজে। কথিত আছে, বল্লাল রাজার সহিত বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ ঢাকায় আসে। পরবর্তীকালে তাহারা দীক্ষা নেয় ইসলাম ধর্মে। প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তাহারা ছড়াইয়া পড়ে। যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশের বেদেরা মোট নয়টি শাখায় বিভক্ত। এইগুলি হইল লাউয়ো বা বাবাজিয়া, চাপাইল্যা, বাজিকর, বেজ বা মিচ্ছিগিরি, গাইন, মেল্লছ, বান্দাইরা, মাল এবং সাপুড়িয়া। ইহাদের প্রধান পেশা—চিকিত্সা ও ঔষধ বিক্রয়। নানারকমের বুনো লতাপাতা আর শিকড়বাকড়ের পাশাপাশি ইহাদের চিকিত্সা পদ্ধতিতে মন্ত্র তথা ঝাড়ফুঁকের প্রয়োগ অত্যন্ত বেশি। তবে নূতন যুগের কারণে বেদেদের অবৈজ্ঞানিক চিকিত্সার প্রতি আস্থা কমিয়া গিয়াছে সাধারণ মানুষের। আগের মতো মানুষ সাপখেলা দেখিয়াও আর আনন্দ পায় না। তাই ধস নামিয়াছে বেদেদের ঐতিহ্যগত পেশায়। টান পড়িয়াছে তাহাদের রুজি রোজগারেও। এইসকল কারণে বেদেদের অনেককেই এখন নৌকার বহর ছাড়িয়া বিভিন্ন শহরের আনাচেকানাচে, রেললাইনের পাশে দেখা যায়। বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিরুদ্ধে সাপ দেখাইয়া টাকা আদায় করিবার দৃশ্যও চোখে পড়ে প্রায়শই। তবে সহজ-সরল জীবনযাপনকারী বেদেরা এমনিতেই অত্যন্ত সত্ প্রকৃতির। অপরাধ করিয়া গুরুতর শাস্তির ভয় থাকিলেও দলনেতার নিকট অপরাধ স্বীকার করিতে তাহারা কুণ্ঠিত হয় না।
বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বেদেদের রহিয়াছে নিজস্ব জীবনবোধ ও স্বকীয়তা। সুতরাং বেদে সম্প্রদায়কে বিলুপ্তির হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য তাহাদের জীবনমান উন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।