ইংরেজিতে বলা হয় স্টেট অর্গান। এক কথায় রাষ্ট্র পরিচালনায় যে প্রতিষ্ঠানগুলি অপরিহার্য, অর্থাৎ এক্সিকিউটিভ বা নির্বাহী, জুডিশিয়ারি বা বিচার এবং লেজিসলেটিভ বা আইন বিভাগ; এবং এই বিভাগগুলির অধীন প্রতিষ্ঠানগুলিই রাষ্ট্রের অর্গান হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। এই তিনটি বিভাগের অধীন সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে মুখ্য দায়িত্ব থাকে জনগণের নাগরিক অধিকার রক্ষা, সমাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকদের তাহাদের কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করিয়া শৃঙ্খলা আনয়ন করা। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে, অথবা প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল হইলে রাষ্ট্র অকার্যকর হইয়া পড়ে। ফলে যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো মূল্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে সচল রাখা এবং নির্বিঘ্নে কার্য পরিচালনার ব্যবস্থা করা একান্ত কর্তব্য। দেশে একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসিয়াছে। দীর্ঘ শাসনের পর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করিয়া শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করিয়াছেন। তাহার পর লক্ষ করা গিয়াছে, কিছু মানুষ দেশের পার্লামেন্টে প্রবেশ করিয়াছে, গণভবনে ভাঙচুর চালাইয়াছে এবং লুটপাট করিয়াছে, যাহা লইয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সকল পক্ষই উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে। ইহার সহিত দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তা বিধান ও তাহাদের উপর আক্রমণ করা হইতে বিরত থাকিতে সকল পক্ষ হইতে অনুরোধ জানানো হইয়াছে।
অনেকের মধ্যে দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে তাহা আমরা বুঝিতে পারি: কিন্তু সরকারের পরিবর্তন আর রাষ্ট্রকে অকার্যকর করিয়া ফেলা এক কথা নহে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছে। তদুপরি অনেককে ঠেকানো যাইতেছে না। এখন নতুন প্রজন্মের জয়যাত্রার সময়। ইতিমধ্যে ছাত্র আন্দোলনে অসংখ্য শিক্ষার্থী মেধা, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়াছেন। তাহাদের বক্তব্য, আন্দোলনের ধারা সকল কিছুর মধ্যেই তাহার প্রতিফলন দেখা গিয়াছে; কিন্তু দেশের কিছু অবিবেচক মানুষ তরুণ প্রজন্মের প্রশংসনীয় ও সাহসী ভূমিকাটিকে কলুষিত করিতে চেষ্টা করিতেছে। সেই জায়গাটি হইতে তাহাদের অচিরেই সরিয়া আসিতে হইবে। তাহা না হইলে দুর্নামের দায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ঘাড়ে গিয়া বর্তাইবে, যাহা মোটেও কাম্য নহে।
বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। এই দেশে সুফি, দরবেশ, ইমাম, সাধু-সকলে মিলিয়া একত্রে বসবাস করিতে অভ্যস্ত; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কখনো কখনো সুযোগসন্ধানীদের সুযোগ গ্রহণ করিতে দেখা যায়, যাহার শিকার হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ইহা যে মোটেই ইসলামসম্মত নহে তাহা আমাদের সর্বদা মনে রাখিতে হইবে। এই জন্য সকলকে ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনিতে সহায়তা করিতে হইবে। ১৮ কোটি মানুষের একটি আধুনিক দেশে যদি পরিবর্তন আসে, তাহা হইলে নতুন করিয়া প্রতিষ্ঠানগুলিকে সাজাইতে খানিকটা সময় প্রয়োজন হয় বইকি। আর সেই সময়টাই আমরা অতিবাহিত করিতেছি। সুতরাং এমন ক্লান্তিলগ্নে সকলকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হইবে। যাহাতে অপরাধী কিংবা সুযোগসন্ধানীরা আমাদের জানমালের কোনো ক্ষতিসাধন করিতে না পারে, ইহার জন্য এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করিতে হইবে।