'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে লিখিয়াছেন, 'কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।' বর্তমানে দেশের ক্রান্তিলগ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথা আমাদের বারংবার স্মরণে আসিতেছে। চারিদিকে যখন ভয়-আতঙ্ক, খুনখারাবি, চুরি-ডাকাতি, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি দেখা দিয়াছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনুপস্থিতিতে অরাজকতার সুযোগ লইয়া একশ্রেণির অবিবেচক মানুষ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াইয়া পড়িতেছে, তখনো আমরা মানুষের উপর হইতে আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস হারাইতে চাহি না। যখন করোনা মহামারির সময় করোনা আক্রান্ত মা-বাবাকেও সন্তানরা ফেলিয়া চলিয়া যায়, যখন হৃদরোগে মারা গেলেও গ্রামবাসী করোনা সন্দেহে এলাকায় তাহার লাশ দাফন করিতে বাধা দেয়, তখনও আমরা দেখিয়াছি একদল সাহসী ও বিবেকমান মানুষ দাঁড়াইয়া গিয়াছেন মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা রক্ষার মিছিলে। এখনো একদল তরুণ শিক্ষার্থী ও সাধারণ সচেতন মানুষ এই বিপদ ও সংকটকালে সুনাগরিকের পরিচয় প্রদান করিতেছেন। গাহিয়া চলিয়াছেন মানবতার জয়গান।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার ঢাকা উদ্যান ৪ নাম্বার রোডের ৩৩ নাম্বার বাসার ছাদে খেলিতে গিয়া গলির ভিতরে একটি শটগান, কিছু তাজা গুলি ও গুলির কয়েকটি খোসা দেখিতে পায় শিশুরা। তাহাদের অভিভাবকরা সেনাবাহিনীকে খবর দিলে গত শুক্রবার তাহারা এই সকল রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধার করেন। এইখানে দেখা যাইতেছে, অভিভাবকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাহা জমা দিয়া নাগরিক দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। সাম্প্রতিক সহিংসতার সময় থানা হইতে যেই সকল সরকারি অস্ত্র লুটপাট হইয়াছে, তাহা ফেরত না দেওয়া হইলে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকিয়াই যায়, যাহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। তাই এই মুহূর্তে ইহা আমাদের জরুরি কর্তব্যও বটে। শুধু ঢাকার মোহাম্মদপুরেই নহে, সাতক্ষীরায়ও ঘটিয়াছে এমন ঘটনা। এই জেলার শ্যামনগর থানা হইতে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি ফেরত দিয়াছেন এক কৃষক। তিনি থানার পিছনে জমি চাষ করিয়া দুইটি শটগান, চারটি রাইফেল, পাঁচটি ম্যাগাজিন ও ৫১ রাউন্ড গুলি দেখিতে পান। তাহার পর স্থানীয় একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং পরে ডিজিএফআই ও ডিএসবির সদস্যরা তাহা উদ্ধার করেন। আবার শ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সম্মুখে থাকা পুলিশের মোটরসাইকেল, দুইটি পোড়া মোটরসাইকেল এবং থানার একটি ফ্রিজও ফিরাইয়া দিয়াছেন কয়েক জন ব্যক্তি। এমনকি গণভবন হইতে লুট হওয়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ জমাদানের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। এই সকল ঘটনা হইতে আমরা উপলব্ধি করিতে পারি, এই দেশে যেমন অশুভ ও অবিবেচক মানুষ রহিয়াছে, তেমনি বিবেকবান ও মনুষ্যত্বের অধিকারী মানুষের সংখ্যাও কম নহে। এই যে ছাত্র ও পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিয়া মানুষ সরকারি মূল্যবান জিনিসপত্র ফিরাইয়া দিতেছে তাহা অত্যন্ত সাধুবাদযোগ্য।

সমাজের যাহারা দুষ্ট লোক এবং ন্যায়-অন্যায় ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, তাহারা আমাদের ঘুম কাড়িয়া লইতেছে। তবে ইহার বিপরীতে একশ্রেণির এমন সচেতন ও সভ্য মানুষ আছেন, যাহারা মানুষের আপদবিপদে পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়ান। মন্দির-প্যাগোডা পাহারায় শামিল হন। ইহাই মনুষ্যত্বের স্বাভাবিক দাবি। এই জন্য ভূপেন হাজারিকা তাহার এক বিখ্যাত গানে বলিয়াছেন, 'মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?' এইরূপ নীতিবাক্য মানিয়া চলিবার মানুষের সংখ্যা সমাজে যতই বাড়িবে, ততই সমাজ ও রাষ্ট্র সঠিক ও ন্যায়ানুগ পথে থাকিবে। আবার অ্যারিস্টটল বলিয়াছেন, 'মানুষ বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী, যখন সে আইন ও বিচারক্ষমতাসম্পন্ন থাকে, তখন সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, আর যখন সে আইন ও বিচারক্ষমতা হারাইয়া ফেলে, তখন সে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম প্রাণী'। এই জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ দেশ গঠন করিতে হইলে সকলের পূর্বে আমাদের মধ্যে সুনাগরিক ও মনুষ্যত্ববোধ জাগাইয়া তুলিতে হইবে।