দূর হউক 'ক্ষুধামুক্ত' বিশ্ব গড়িবার সকল বাধা

কবি সুকান্ত লিখিয়াছেন-ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। তিনি বলিয়াছেন যে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কবিতা লেখা যায় না। প্রায় একই কথা বলিয়াছেন মহাকবি কালিদাস। তিনি বলিয়াছেন যে, ঘরে অন্নের চিন্তা থাকিলে কোনো কাজই সফল হয় না। কাহিনিটি এই রকম যে, একদিন কালিদাস রাজসভার উদ্দেশে রওয়ানা হইবেন; এমন সময় গৃহিণী তাহাকে বলিলেন, 'ঘরে তণ্ডুল বাড়ন্ত: আসার সময় তণ্ডুল নিয়ে এসো'; কালিদাস ভাবিতে ভাবিতে রাজসভায় উপস্থিত হইলেন। সেই দিন রাজা বিক্রমাদিত্য কয়েকটি সমস্যা সমাধানের জন্য কালিদাসকে দায়িত্ব দেন; তিনি কিন্তু কোনো সমস্যারই সমাধান করিতে পারেন না। বিস্মিত রাজা কালিদাসকে কারণ জিজ্ঞাসা করিলে কালিদাস বলেন, 'অন্নচিন্তা চমৎকারা, কাতরে কবিতা কুতঃ।' অর্থাৎ, অন্নচিন্তায় কালিদাস বুদ্ধিহারা।

প্রকৃতপক্ষে, মানুষের সবচাইতে মৌলিক চাহিদা হইল ক্ষুন্নিবৃত্তি। এই জন্য আরো এক দশক পূর্বে জাতিসংঘ লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করিয়াছিল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে 'ক্ষুধামুক্ত' করা হইবে। দুঃখজনকভাবে, সম্প্রতি জার্মানির কৃষি অর্থনীতিবিদ মার্টিন কাইম বলিয়াছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করা সম্ভব হইবে না। কৃষি অর্থনীতিবিদদের ৩২তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি বলিয়াছেন যে, এখন সমগ্র বিশ্বে যেই ধরনের অপুষ্টি এবং ক্ষুধা দেখা যাইতেছে, তাহা উন্নয়নকে ধাক্কা দিতেছে। ফলে আগামী ছয় বৎসরের মধ্যে ঐ লক্ষ্য পূরণ করা
প্রায় অসম্ভব।

স্মরণ করা যাইতে পারে, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সমস্ত সদস্য দেশ ১৭টি ক্ষেত্রে টিকসই উন্নয়নের যে লক্ষ্য (এসডিজি) স্থির করিয়াছিল, তাহার মধ্যে দ্বিতীয়টি হইল ২০৩০ সালের ভিতরে বিশ্বের সমস্ত মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করা। সকল উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশই শামিল হইয়াছে এই কর্মসূচিতে; কিন্তু তথ্য বলিতেছে, গত কয়েক বৎসরে যেইভাবে করোনা মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধে ধনী-দরিদ্রের আর্থিক বৈষম্য বাড়িয়াছে তাহাতে মাত্র ছয় বৎসরের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করা সম্ভব হইবে না বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। তাহা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তাপ সমস্যা আরো বাড়াইতেছে বলিয়া মনে করেন অর্থনীতিবিদ কাইম। বিশেষ করিয়া, যেই ভাবে বিশ্বে খাবার তৈরি, বিপণন এবং খাওয়া হয়, গত কয়েক দশকে তাহার বিশাল কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। আর তাহা না হইলে ১৭টি লক্ষ্যের কোনোটিই ছোঁয়া যাইবে না বলিয়া তিনি মনে করেন।

মাত্র কয়েক বৎসর পূর্বে বিশ্বে প্রতি ৯ জনে এক জন অপুষ্টির শিকার। এই হিসাবে অপুষ্টির শিকার মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি। এই জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস এশিয়া মহাদেশে। সমগ্র বিশ্বে প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ালেখা করে-এমন প্রায় সাড়ে ছয় কোটি শিশু পেটে ক্ষুধা লইয়া স্কুলে যায়। এই জন্য লক্ষ্য রহিয়াছে, কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা। নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, পশু পালনকারী, জেলেদের মতো জনগোষ্ঠীর জন্য ভূমি নিরাপত্তা, শিক্ষা, আর্থিক লেনদেনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার উৎস নিশ্চিত করা। টেকসই কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কৃষি উৎপাদনে পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাহাতে ফসল টিকিয়া থাকিতে পারে, তাহা নিশ্চিত করা। বিশ্ব খাদ্য পণ্যের বাজারে দাম স্থিতিশীল ও ক্রেতার হাতের নাগালের মধ্যে রাখিতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জাতিসংঘের নিকট আমরা শুনিয়াছি। সংঘাতময় স্থানগুলিতে মানবিক, উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতিমালাগুলিকে ভুলিলে চলিবে না। সুতরাং এই অবস্থায়, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু হইতে শুরু করিয়া খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা সকল মানুষের ক্ষুধা দূর করিবার বৈশ্বিক অঙ্গীকারে সবাইকে অটল থাকিতে হইবে।