'শান্তি' শব্দটি সকলের নিকট প্রিয়, সকলের আরাধ্য। তবু শান্তি যেন অধরা। আভিধানিক অর্থে শান্তি হইল এমন পরিস্থিতি, যেইখানে নাই কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। চিত্ত যেইখানে ভয়হীন। যেইখানে নাই কোনো উৎপাত, উপদ্রব, বৈষম্য, জুলুম ও অত্যাচার; কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর মানুষ কি শান্তিতে আছে, না শান্তিতে থাকিতে পারিতেছে? যুদ্ধবিগ্রহ ও গোলযোগ কমবেশি সকলখানেই আছে। দুই বৎসরের অধিককাল ধরিয়া ইউক্রেন অশান্ত। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া দেশে দেশে অশান্তি এখনো দূর হয় নাই। ইউরোপের দেশসমূহ এখনো তটস্থ। ইহারই মধ্যে গত কয়েক মাস ধরিয়া ফিলিস্তিনের গাজায় চলিতেছে ধ্বংসযজ্ঞ। গণহত্যার পাশাপাশি চলিতেছে নারকীয় তাণ্ডবলীলা। এখন গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া পুরা মধ্যপ্রাচ্য অস্থির। ইরান, ইয়েমেন, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে কেবলই বাড়িতেছে টেনশন। অনেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের আশঙ্কা করিতেছেন। বিশ্বযুদ্ধে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ও মানবতার আহাজারি তৈরি হয়, তাহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা হইতেই আমরা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারি। এই জন্য বিশ্বের বহুমেরুকরণের যুগে সুসংহত বিশ্বব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সর্বত্র অরাজকতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বশান্তি অথবা ব্যক্তিগত বা সামাজিক শান্তি যেন সুদূর পরাহত।
মানুষ সামাজিক জীব। এই জন্য শুধু নিজে শান্তিতে থাকিবার কোনো মানে হয় না। সকলকে লইয়াই আমাদের শান্তির অন্বেষণ করিতে হইবে। এমনকি পাড়া-প্রতিবেশী যেমন, তেমনি বিভিন্ন দেশের মধ্যেও শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। নতুবা আমরা কেহই শেষ পর্যন্ত শান্তিতে থাকিতে পারিব না। শুধু যুদ্ধবিগ্রহ, নির্যাতন-নিপীড়ন, বৈষম্য ও শোষণ-অপশাসনই নহে, ক্ষুধা-দারিদ্র্য থাকিলেও আমরা শান্তিতে ঘুমাইতে পারিব না। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভারসাম্যতা প্রভৃতির উপরও নির্ভর করে শান্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে শান্তি, একতা, সমঝোতা ও মিত্রতা প্রতিষ্ঠা করিবার লক্ষ্যে বিশ্বশান্তি ধারণাটি বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসী অনুধাবন করিতে পারেন দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, যুদ্ধ প্রভৃতি শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্তরায়। এই দৃষ্টিকোণ হইতে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা গঠিত হইলেও সমগ্র বিশ্বে প্রত্যাশিত শান্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বরং সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখন আমরা দেখিতে পাই সংঘাত-সংঘর্ষ ও অসহিষ্ণুতা। আবার ইহার পাশাপাশি আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কারণে অসংখ্য মানুষ মারা যাইতেছে ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া। পারস্পরিক সহিষ্ণুতার অভাবে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর উপর, এক দেশ অন্য দেশের উপর আক্রমণ করিতেছে। ইহাতে বিঘ্নিত হইতেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
বিস্ময়কর হইলেও সত্য যে, যাহারা অশান্তি সৃষ্টিকারী, তাহারাও মাঝেমধ্যে শান্তি স্থাপনের কথাই বলেন। এমনকি শান্তির নামে অশান্তি সৃষ্টি করিবার তৎপরতাও কম নহে। অথচ সকল ধর্মের মূল শিক্ষাই হইল শান্তি। যেমন-ইসলাম শব্দটি আসিয়াছে মূল 'সালমুন' শব্দ হইতে। যাহার অর্থ শান্তি, আপস বা বিরোধ পরিহার। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.) মক্কা হইতে মদিনায় হিজরত করিয়া যে 'মদিনা সনদ' রচনা করেন, তাহার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বিবদমান নানা ধর্ম, জাতি, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কলহ-বিবাদ ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর করিয়া ন্যায়-নীতি ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। 'আসসালামু আলাইকুম'-এই ইসলামি সম্ভাষণের অর্থ হইল 'আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক'। বৌদ্ধদের দার্শনিক মতবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হইল, দুঃখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া শান্তি লাভ করা। হিন্দুশাস্ত্রেও আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক শান্তির উপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। বহুল উচ্চারিত মন্ত্র 'ওম শান্তি'র অর্থ হইল' হে ঈশ্বর, আত্মজ্ঞান লাভের সকল বাধাবিঘ্ন দূর করুন'। এইভাবে মন ও ইন্দ্রিয়সমূহের অশান্তি হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইবে। এই জন্য জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক, এমন কামনা করা হয়। তাহা হইলে কেন এত অশান্তি, অবিশ্বাস, সন্দেহ-সংশয়, বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ? এইভাবে আমরা কি মহা আরাধ্য শান্তির দেখা পাইব? সকলের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা এবং আলোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধানের পথ উন্মুক্ত না থাকিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট কি আমরা একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রাখিয়া যাইতে পারিব? ইহাই আজিকার বড় প্রশ্ন।