বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলিয়াছেন যে, ভয় উন্নতির পথে বিশেষ অন্তরায় সৃষ্টি করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আজ এই ভয়ের সংস্কৃতি জাঁকিয়া বসিয়া আছে। সেইখানে পদে পদে ভয়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ভয়হীন জীবন এইখানে যেন দিল্লি দূর অস্ত! এইখানকার অধিকাংশ সরকার গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার' বা ভয় থেকে মুক্তির দিশা দিতে পারে না। অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আনিতে পারে না সুশাসন। এইভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে যতদিন নাগরিকদের নির্ভয়ের জীবন নিশ্চিত না করা যাইবে, ততদিন এই সকল দেশ উঠিতে পারিবে না উন্নতির শিখরে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন: 'ভয় তার বাহিরেতে,/ ভয় তার অন্তরে,/ ভয় তার ভূত-প্রেতে/ ভয় তার মন্তরে।' অর্থাৎ উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলিতে ভয় কোথায় নাই? সবখানেই ভয় আছে কমবেশি। তিনি আরো লিখিয়াছেন: 'দিনের আলোতে ভয়/ সামনের দিঠেতে,/ রাতের আঁধারে ভয়/ আপনারি পিঠেতে' (উজ্জ্বলে ভয় তার, খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)। এইখানে 'দিঠেতে' মানে নজর/দৃষ্টিতে বা ঠিকানায়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেওয়া হয়, সেইখানে 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার'-এর কথাও বলা হয়। ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তাহার স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে ফোর ফ্রিডমস বা চারটি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন। তাহা হইল- মতপ্রকাশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং দারিদ্র্য ও ভয় হইতে মুক্তি। তিনি ভয় হইতে মুক্তি বলিতে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ ও আগ্রাসন বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান নাগরিক অধিকার রক্ষা ও বৈষম্যমূলক সংঘাত কমানোর প্রতি জোর দেন। ইহাতে বুঝা যায়, উন্নয়নশীল বিশ্বে যে ভয়ের পরিবেশ বিদ্যমান, তাহার সহিত কোনো না কোনোভাবে ভূরাজনীতিও জড়িত।
বিশ্বশান্তিতে নাবেলজয়ী রাজনীতিবিদ অং সান সু চি তাহার নোবেল বক্তৃতার আলোকে ১৯৯১ সালে প্রকাশ করেন 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার' নামে একটি বহুল আলোচিত গ্রন্থ। ইহার মূল উপজীব্য হইল মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘন। তাহার মতে, কর্তৃত্ববাদী শাসকরা জনগণকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গড়িয়া তোলে ভয়ের সংস্কৃতি। এই ক্ষেত্রে দমন-পীড়ন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সেন্সরশিপ, হামলা-মামলা ইত্যাদি হাতিয়ার হইয়া উঠে; কিন্তু ইহা হইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পরিত্রাণের উপায় কী? কীভাবে তাহারা ভয়কে জয় করিবে? ইহার উপায় হইল-গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা। ভয় হইতে মুক্তি পাইতে শুধু শারীরিক হুমকির অনুপস্থিতিই নহে, মানসিক ও আবেগীয় স্বাধীনতারও বিকাশ দরকার। নতুবা আমরা ভয়ের সহিত বসবাসের দুর্ভাগ্য হইতে মুক্তি পাইব না। এই ক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দের যেমন শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া প্রয়োজন, তেমনি আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব এবং সমর্থন ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথের উত্থান লইয়া যেইভাবে উন্নত দেশগুলি শঙ্কা প্রকাশ করিতেছে, তাহাতে বিশ্বব্যাপী ভয় ও আতঙ্ক আরো বাড়িবে বইকি। ইহা হইতে মুক্তিতেও বিশ্বনেতৃবৃন্দকে সমাধানের পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবনা অনুযায়ী উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নতির মধ্যে যে গভীর আন্তঃসম্পর্ক রহিয়াছে, এই মুহূর্তে তাহাও আমাদের মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতে হইবে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করিয়াও উন্নয়নশীল দেশগুলির জনগণকে উল্লিখিত ভয়ের সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া আসিতে সহায়তা করিতে হইবে।