কাতারের রাজধানী দোহায় গতকাল বৃহস্পতিবার শান্তি আলোচনা শুরু হইয়াছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লইয়া আলোচনায় বসিতেছে মার্কিন, কাতারি ও মিশরীয় মধ্যস্থতাকারীরা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার পারদ যেইভাবে চড়িতেছে, তাহাতে এই শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি আসিবে কি না, তাহা দুই-এক দিনের মধ্যে আমরা বুঝিতে পারিব। তবে এই আলোচনায় গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন হামাস অংশ লইবে না বলিয়া জানা গিয়াছে। হামাসের দাবি ছিল, চলতি বৎসরের ৩১ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধবিরতির যেই রোড ম্যাপ ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহার ভিত্তিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হউক। নূতন করিয়া আর কোনো আলোচনার দরকার নাই। বাইডেন সেই রোড ম্যাপে তিনটি ধাপের কথা বলিয়াছিলেন। প্রথম ধাপে-ছয় সপ্তাহের মধ্যে ইসরাইলের সেনারা গাজার সমস্ত জনবহুল অঞ্চল হইতে সরিয়া যাইবে। ঐ সময়ের মধ্যেই হামাস ৭ অক্টোবরের হামলায় আটক করা আরো কিছু ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দিবে। পাশাপাশি ইসরাইলকেও কিছু ফিলিস্তিনি জেলবন্দিকে মুক্ত করিতে হইবে। দ্বিতীয় ধাপে-সমস্ত ইসরাইলি বন্দিকে মুক্তি দিতে হইবে। অন্যদিকে ইসরাইল গাজা হইতে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে সরাইয়া লইবে। তৃতীয় ধাপে- গাজায় নূতন করিয়া ভাঙিয়া পড়া ঘরবাড়ির পুনর্গঠন শুরু হইবে। আর্ত মানুষের নিকট আরো অধিক ত্রাণ পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে।
বাইডেন ইতিপূর্বে বলিয়াছেন, তিনি ৩১ মে যেই পরিকল্পনাটির প্রস্তাব (রোড ম্যাপ) করিয়াছিলেন তাহা ইসরাইলের সহিত সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হইয়াছিল। ইহার মধ্যে রহিয়াছে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, জিম্মি-বন্দি বিনিময় এবং গাজার পুনর্গঠন। যুক্তরাষ্ট্র নূতন এই আলোচনা যেই আশা জিইয়ে রাখিয়াছে, তাহা তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র মনে করিতেছে, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব হইলে ইসরাইলে সরাসরি হামলা হইতে বিরত থাকিবে ইরান, ফলে এই অঞ্চলে একটি বৃহত্তর যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হইতে পারে। স্মরণ করা যাইতে পারে, গত ৩১ জুলাই ইরানের রাজধানী তেহরানে গুপ্ত হামলায় নিহত হন হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া। একই দিনে লেবাননে হামলা চালাইয়া দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার ফুয়াদ শুকুরকে হত্যা করা হয়। হামাস ও ইরান এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করিয়াছে। ফুয়াদ শুকুরকে হত্যার ঘোষণা দিয়াছিল ইসরাইল। যদিও তেহরানে ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার কথা অস্বীকার করে ইসরাইল, তবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ভিতর দিয়া মধ্যপ্রাচ্য বৃহত্তর যুদ্ধের টানেলে ঢুকিয়া পড়িয়াছে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। হানিয়াকে হত্যার জন্য ইসরাইলকে কঠোর জবাব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করিয়াছে ইরান। অন্যদিকে কমান্ডার ফুয়াদ শুকুরকে হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়াছে হিজবুল্লাহ। ফলে যে কোনো সময় ইসরাইলের উপর ব্যাপক আকারে হামলা শুরু হইতে পারে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাইয়া আনিতে ইরানকে বুঝাইবার জন্য মিত্রদের নিকট সহায়তা চাহিয়াছে ওয়াশিংটন। এইদিকে ইসরাইলে যাহাতে ইরান হামলা না করে, তাহার জন্য গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য এক বিবৃতিতে তেহরানকে সতর্ক করিয়াছে। তাহারা বলিতেছে, এই ধরনের হামলা হইলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমন করিতে বলিয়াছে। তবে পেজেশকিয়ান বলিয়াছেন, ঐ আক্রমণের জবাব দেওয়ার অধিকার তাহার দেশের রহিয়াছে।
আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হইতে ইসরাইলকে বারংবার যুদ্ধবিরতির তাগিদ দেওয়া হইলেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে নিয়মিত হামলা চালাইয়াই যাইতেছেন। নিহত হইতেছেন অগণিত ফিলিস্তিনি নিরীহ মানুষ। ইহার মধ্যে হামাস- প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা আগুনে ঘি ঢালিয়াছে। আমরা মনে করি, আলোচনা ব্যতীত জগতে কখনো কোথাও কোনো সমাধান আসে নাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইতিপূর্বে যেই রোড ম্যাপ দিয়াছেন তাহার আলোকে নূতন এই আলোচনায় সাময়িক শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়া আসুক। আর উত্তেজনা প্রশমনের পর সকল পক্ষ মিলিয়া বাস্তবোচিত স্থায়ী শান্তির ব্যবস্থা করা হউক।