ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা গতানুগতিক ও অকার্যকর

দেশে আবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়িতে শুরু করিয়াছে। এই দিকে এখনই মনোযোগ না দিলে ইহা পূর্ববর্তী বৎসরগুলির তুলনায় মারাত্মক আকার ধারণ করিতে পারে। একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশে প্রধানত বর্ষাকালে ডেঙ্গুর উপদ্রব দেখা যাইত; কিন্তু গত কয়েক বৎসর ধরিয়া ১২ মাস এই রোগের প্রকোপ দেখা যাইতেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চলতি বৎসরের জানুয়ারি হইতে আজ পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন। সাম্প্রতিক সময়ে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা ও সময়কাল উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে, যাহা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর হুমকি।

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হইতেছে এডিস মশার প্রজনন হার। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে, যাহা বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে জমিয়া থাকা পানিতে সহজেই বৃদ্ধি পায়। আর এই বর্ষাকালে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে, বিশেষ করিয়া গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কোথাও না কোথাও পানি জমিয়া থাকে। যাহার ফলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা প্রায় অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে। 

ডেঙ্গুর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং ইহার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ভয়াবহ। ডেঙ্গুর সামাজিক প্রভাবের মধ্যে রহিয়াছে পরিবারের আর্থিক সংকট, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া। উদাহরণ হিসাবে বলা যাইতে পারে, একজন দিনমজুর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইলে তাহার পরিবারের আয় বন্ধ হইয়া যায়, তাহার উপর আবার ডেঙ্গুর চিকিৎসার খরচ রহিয়াছে, যাহা তাহাদেরকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলিয়া দেয়। বলা হয়, কোনো ভূখণ্ডে যদি একবার ডেঙ্গু দেখা দেয়, তাহা হইলে সেটিকে পুরাপুরিভাবে নির্মূল করিবার কোনো উপায় নাই; বড়জোর নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর, নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হইল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন। অথচ, বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা গতানুগতিক ও অকার্যকর পদ্ধতিতে আটকাইয়া রহিয়াছে। মশক নিধন কার্যক্রম কীটনাশক স্প্রে করিবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যাহা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ইহা মশার প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াইয়া দিতে পারে। ইহা ছাড়া কীটনাশক স্প্রে করিবার সময়সূচি ও পদ্ধতি অধিকাংশ সময় থাকে অসমন্বিত ও অপর্যাপ্ত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হইলেও সরকারি হাসপাতালগুলির পরিবেশ ও কর্তব্যরতদের আন্তরিকতা লইয়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠিতে দেখা যায়। আবার ডেঙ্গু সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব, মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে অজ্ঞতা, জনসাধারণের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা ডেঙ্গুর বিস্তারকে আরো সহজ করিয়া দিতেছে।

অন্যান্য বৎসরের তুলনায় এই বৎসর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশ পূর্বেই দেখা দিয়াছে। বর্ষার আগমনে ইহা সমগ্র দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, যাহার ফলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব যে কোনো সময় মহামারির দিকে চলিয়া যাইতে পারে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় গতানুগতিক পদক্ষেপ বাদ দিয়া বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। তাহা না হইলে দেশের এই ক্রান্তিকালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হইতে পারে।

আমাদের দেশে ডেঙ্গুতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর অন্যতম কারণ কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সকল ডেঙ্গু রোগী জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলিয়া আসে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকর না করিতে পারিলে এই সংখ্যা বাড়িতেই থাকিবে। গত বৎসর আগস্ট হইতে অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বড় হাসপাতালগুলিতে এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাইতেছিল। মেঝেতেও জায়গার সংকুলান করা যাইতেছিল না। যদি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে জটিল রোগীকে (বাচ্চা, গর্ভবতী নারী বা বয়স্ক মানুষ) পর্যবেক্ষণের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখিবার ব্যবস্থা না থাকে, হাসপাতাল যদি ওয়েল-ইকুইপড না হয়, যথেষ্টসংখ্যক ডাক্তার ও নার্স না থাকে; তাহা হইলে রোগীরা স্বভাবতই ঢাকামুখী হইবে। সেই ক্ষেত্রে ঢাকা যাইতে যাইতে রোগীর স্বাস্থ্যের আরো অবনতি হইবে এবং মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়িবে। বর্তমানে দেশের সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লাগিয়াছে। তাই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করিবার এখনই উপযুক্ত সময়। ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মৌসুমে আমাদের অধিক সতর্কতা ও সচেতনতার বিকল্প নাই।