দানিউব ও নদী ব্যবস্থাপনা

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলি নদী বা সমুদ্রকে কেন্দ্র করিয়াই গড়িয়া উঠে। এই আধুনিক যুগেও পরিবহনসহ নানা কারণে নদনদী ও নৌপথের গুরুত্ব অপরিসীম; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে নদী ও পানিসম্পদের সদ্ব্যবহার লইয়া প্রশ্ন রহিয়াছে। দখল- দূষণের কারণে ও নাব্য সংকটে কোথাও কোথাও নদনদীর ঘটিয়াছে অপমৃত্যু। যদিও আগামীর বিশ্বযুদ্ধ পানিসম্পদকে কেন্দ্র করিয়া। শুরু হইবে বলিয়া বহুদিন ধরিয়া আশঙ্কা ব্যক্ত করা হইতেছে, তথাপি এই সকল দেশ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নদীগুলির ব্যবস্থাপনা লইয়া আজও উদাসীন। একটি নদী সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে একাধিক দেশের মধ্যে সম্প্রীতি ও মায়ার বন্ধন তৈরি করিতে পারে, তাহার অন্যতম উদাহরণ হইল দানিউব নদী। ইহা হইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারে।

আমরা জানি, পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়াছিল যেই সকল স্থানে, সেই সকল স্থানের মধ্যে দানিউব উপত্যকা অন্যতম। পৃথিবী বিখ্যাত বিভিন্ন গল্পে, কবিতায় দানিউব নদীর উপস্থিতিই সবচাইতে অধিক। এমনকি দানিউবের কথা উঠিয়া আসিয়াছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি-লেখকের ভ্রমণকাহিনিতেও। দানিউব হইল ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। ভলগা নদীর পর ইহার অবস্থান। এই নদীর তীরে গড়িয়া উঠিয়াছে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য নিদর্শন। ইহা ইউরোপ মহাদেশের অন্যতম প্রধান পরিবহন পথ। উৎপত্তি জার্মানির ব্ল‍্যাক ফরেস্ট অঞ্চলে। সেইখান হইতে ইহা পূর্বদিকে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার প্রবাহিত হইয়া রোমানিয়ার উপকূলে কৃষ্ণসাগরে পতিত হইয়াছে। দানিউব ১০টি দেশের সীমান্ত জুড়িয়া রহিয়াছে। দেশগুলি হইল-ইউক্রেন, মলদোভা, রোমানিয়া, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া ও জার্মানি। এই নদীর উপর অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির মধ্যে আছে জার্মানির উল্ল্য, রেগেন্সবুর্গ ও পাসাউ; অস্ট্রিয়ার লিঙ্গ ও রাজধানী ভিয়েনা; স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভা; হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট: সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড এবং রুমানিয়ার গালাতি ও ব্রাইলা: কিন্তু এই নদীর পানি বণ্টন বা বাণিজ্যপথ লইয়া শুনা যায় না তেমন কোনো অভিযোগ। নাই দখল-দূষণের উৎপাত। বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত দানিউব। পাহাড়, বন, জঙ্গল, উঁচুনিচু ও সমতল ভূমির পথে বহিয়া চলিয়াছে এই নদী। নিরাপদে ও নির্ঝঞ্ঝাটে। ইহার তীর জুড়িয়া গড়িয়া উঠিয়াছে আধুনিক সভ্যতার সকল স্থাপনা। ইহার দুই পার্শ্ব এত শক্ত করিয়া বাঁধাই করা যে, প্রবল স্রোতের বন্যায় বাঁধ ভাঙার কোনো আশঙ্কা নাই। দানিউবের তীর ঘেঁষিয়া রহিয়াছে সুন্দর রাস্তা। ইহা প্রায় ২ কোটি মানুষের পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ, সেচ ও শিল্প, মৎস্যসম্পদ প্রভৃতির বড় উৎস; কিন্তু ইহা লইয়া নাই কোনো দ্বন্দ্ব বা সংঘাত-সংঘর্ষ।

বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলাইয়া রহিয়াছে সাড়ে ৭০০ নদী; কিন্তু আমরা কি তাহার নাব্য ও পরিবেশ রক্ষা করিতে পারিতেছি? ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ১৪ হাজার ৩৮ কিলোমিটার। ২ হাজার কিলোমিটার কমিয়া পাকিস্তান আমলে ইহার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার কিলোমিটার, শুকনা মৌসুমে যাহা দাঁড়ায় ৮ হাজার কিলোমিটারে। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে নদী খননের পরও তাহা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারে ঠেকিয়াছে। ইহা ছাড়া আমাদের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী রহিয়াছে যাহার মধ্যে ৫৪টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন এবং তিনটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অভিন্ন। ইহা ছাড়া এই সকল নদীর অন্যান্য অববাহিকাভুক্ত দেশ হইতেছে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীন।

দানিউবের মতো আমাদের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলিরও সুন্দর ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে। এই জন্য দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। দরকার অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যা ও পারস্পরিক উদ্বেগের অবসান। তাহা হইলেই বর্তমানে বাংলাদেশের আটটি জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করিয়া যেই সকল অভিযোগ উঠিয়াছে তাহার নিরসন হইতে পারে। আমরা আশা করি, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির ব্যবস্থাপনা লইয়া নূতন করিয়া আলাপ-আলোচনা গতিশীল হইবে। এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হইবে নায্যতা ও সমঅধিকার। ইহার সহিত চলমান বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করিতে হইবে।