পঞ্চদশ শতকে জার্মান পারদি টমাস কেমপিস তাহার 'দ্য ইমিটেশন অব ক্রাইস্ট' গ্রন্থে লিখিয়াছিলেন-ইংরেজিতে কথাটি দাঁড়ায়- 'ম্যান প্রোপোজেস, বাট গড ডিসপোজেস।' বাংলায় ইহার ভাবার্থ হইল-মানুষ একরকম চিন্তা করে বা প্রস্তাব করে; কিন্তু ঘটনা ঘটে আরেক রকম। পবিত্র কুরআন শরিফে বলা হইয়াছে- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সবচেয়ে উত্তম পরিকল্পনাকারী' (সুরা আনফাল: ৩০ এবং আল ইমরান: ৫৪)।
অর্থাৎ মানুষ যেইভাবে পরিকল্পনা করুক না কেন, সৃষ্টিকর্তার মনে কী রহিয়াছে, আমরা তাহা জানি না। আমরা জানি না বটে; কিন্তু আমরা যাহা করিতে পারি, তাহা হইল নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখা। এমনিতেই আধুনিক জীবনে মানসিক চাপের শেষ নাই। বিশ্বময় এত অশান্তি এত যুদ্ধবিগ্রহ, ঘরে-বাহিরে, পথে-পথে, পদে-পদে এত সমস্যা যে, মনে হইতে পারে-এই সময়ের মানুষ ইহকালেই যেন নরকের রিহার্সেল করিতেছে। এই ক্ষেত্রে নিভৃতে নিরিবিলি আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজেকে এই প্রশ্ন করা যাইতে পারে-এত স্ট্রেস বা মানসিক চাপ লইয়া বাঁচা যায় কী করিয়া? সমস্যার তো শেষ নাই। অবস্থা এমন যে, যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ; কিন্তু তাহার পরও কথা আছে। কথাটি হইল-অনেক জ্ঞানীগুণীর মতে, আধুনিক জীবনে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হইল আমাদের কর্মের চালিকাশক্তি; অর্থাৎ মানসিক চাপ হইল ঘানি। আর সেই ঘানি আমাদের ভিতর হইতে নিংড়াইয়া কর্মরস বাহির করে। তরুণরা যেইহেতু স্বপ্নের কারিগর হয়, তাহাদের সম্মুখে পড়িয়া থাকে দীর্ঘ জীবন। সেই কারণে জীবনের নিয়মে তাহাদের উদ্বেগ- উৎকণ্ঠাও অধিক থাকে। এই জন্য কিছুদিন পূর্বে একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, তরুণ শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগে জর্জরিত। তবে আমাদের মনে রাখিতে হইবে, বিখ্যাত মনীষীরাও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবল মানসিক চাপে পিষ্ট হইয়াছেন। এই অবস্থায় সবচাইতে জরুরি বিষয় হইল-প্রথম নিজেকে জানা। প্রকৃত আত্মোপলব্ধি থাকিলে প্রবল মানসিক চাপের একটি 'সেফটি ভালব' তৈরি হইয়া যায়, প্রেসার কুকারের মতো। তাহাতে ভয়ংকর বিপদ হইতে বাঁচা যায়। উদ্বেগের ক্ষেত্রে উইনস্টন চার্চিল বলিয়াছেন, 'যখন আমি আমার সমস্ত উদ্বেগের দিকে ফিরিয়া তাকাই, তখন আমার সেই বৃদ্ধের গল্পটি মনে পড়ে, যিনি তাহার মৃত্যুশয্যায় বলিয়াছিলেন- তাহার জীবন দুশ্চিন্তাজনিত কষ্টে জর্জরিত ছিল, যেই সকল দুশ্চিন্তার প্রায় কোনোটাই কখনো ঘটে নাই।' এই কথা যেমন সত্য, তেমনি ইহাও সত্য যে, মানুষ এমন অনেক বিপদে পড়ে, যাহা সে কখনো কল্পনাই করে না। বিখ্যাত কবি খলিল জিবরান অবশ্য মনে করিতেন, 'আমাদের উদ্বেগ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া আসে না, বরং আসে ইহাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার প্রচেষ্টা হিসাবে।' এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি করিয়াছেন হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, 'কোনো কিছুতে ব্যর্থ না হইয়া বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।'
সুতরাং ব্যর্থতা জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। ইহারও মূল্য রহিয়াছে। যখন মনে হয়, টানেলের শেষ প্রান্তেও কোনো আলো নাই-তখন অবশ্যই জানিতে হইবে যে, ইহা শতভাগ বিভ্রান্তিমূলক ভাবনা। কারণ, আমরা কখনোই আমাদের 'ভবিষ্যৎ' জানি না। আমরা যাহা যেইভাবে ভাবি, কখনোই তাহা সেইভাবে হয় না। অতীতেও হয় নাই, ভবিষ্যতেও হইবে না। সুতরাং টানেলের শেষ প্রান্তে অবশ্যই আলো রহিয়াছে। শুধু প্রশ্নটা হইল, টানেলটা কতখানি লম্বা এবং আপনি সেই লম্বা টানেল পাড়ি দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছেন কি না, কিংবা ভয় পাইতেছেন কি না। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে সহজ ভাবনা হইল-টানেলের পথ লইয়া ভাবিয়া দেখিবার দরকার নাই, কখনো না কখনো আলো তো আসিয়া পড়িবেই-এই বিশ্বাস রাখিয়া আগাইয়া যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং আখেরে সত্যিই দেখা যায়- টানেলের শেষ প্রান্তে আলো রহিয়াছে। সুতরাং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে আমাদের নিজের উপর বিশ্বাস রাখিতে হইবে।