মনোহরগঞ্জের বটবৃক্ষ মিজানুর রহমান

সৌদি প্রবাসী মিজানুর রহমান সুমন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের মানুষের কাছে বটবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। প্রবাসে থেকেও আর্ত মানবতার সেবায় সবসময় দাঁড়িয়েছেন দুর্দশাগ্রস্থদের পাশে। নিজ এলাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসহায় মানুষদের মানবিক বিবেচনায় বিভিন্নভাবে করেছেন আর্থিক সহায়তা। এবারের বন্যায় (কুমিল্লা-০৯) আসনের মনোহরগঞ্জ-লাকসাম এ দুই উপজেলায় ২০ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা ও দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও’র) কাছে নগদ সাড়ে দশ লক্ষ টাকা অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। 

একজন মিজানুরের প্রতি এলাকার মানুষের রয়েছে পূর্ণ আস্থা ও ভালোবাসা। এ ভালোবাসার প্রতিদানও দিয়েছেন তিনি। অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগীতার হাত বাড়ানোর জন্য নিজ এলাকার বাহিরেও তার সুনাম রয়েছে। তার ব্যক্তিগত এ দানে কোন প্রত্যাশা নেই। অসহায়দের মুখে হাসি ফোটানোই যেন তার কাজ। ‘কেবল সেবা নয়, মানুষকে দাও তোমার হৃদয়। হৃদয়হীন সেবা নয়, তারা চায় তোমার অন্তরের স্পর্শ’- মাদার তেরেসার স্মরনীয় এ উক্তির প্রতিপাদ্যে উজ্জ্বীবিত তেমনি একজন ব্যতিক্রম মানুষ সৌদি আরব প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সুমন। সম্প্রতি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের ২৩টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মান করে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয় অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার্ত সাহায্যের পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দিয়েছেন আর্থিক অনুদান। বিশেষ করে নিজ এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেশে বিদেশে আজ বেশ প্রশংসিত।

মিজানুর রহমান সুমন ১৯৮৫ সালের ১৫ এপ্রিল মনোহরগঞ্জ উপজেলার ঝলম দক্ষিণ ইউনিয়ন এর বচইড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার মৃত আবুল হোসেন। মায়ের নাম গোলাপজান। দানশীলতায় অনন্য ভ‚মিকার জন্য দেশ-বিদেশে তিনি আজ বেশ প্রশংসিত। তার দানের হাত এতই প্রসারিত যে কেউ বিপদগ্রস্থ অবস্থায় তাকে বিষয়টি অবহিত করলে মানবতার কল্যাণে সর্বাত্মক সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন তিনি।

এবারের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় তিনি (কুমিল্লা-০৯) আসনের মনোহরগঞ্জ-লাকসাম এ দুই উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন, তাছাড়া বন্যা কবলিত মানুষের সহযোগীতায় তার প্রতিনিধির মাধ্যমে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সাড়ে ৫ লক্ষ টাকার চেক ও লাকসাম প্রেস ক্লাবের দপ্তর সম্পাদক ফারুক আল শারাহ’র মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ৫ লক্ষ টাকার চেকসহ মোট সাড়ে ১০ লক্ষ টাকার চেক হস্তান্তর করেন। ২৮ আগষ্ট বুধবার মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজালা রানী চাকমা ও লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি নিজ এলাকায় ২৩টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তার হাত ধরে মনোহরগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপসনালয় পেয়েছে আর্থিক অনুদান। এর মধ্যে মনোহরগঞ্জের বড়কেশতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বি-তল ভবন নির্মাণ, লক্ষণপুর নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বি-তল ভবন করে দেয়ার লক্ষ্যে আর্থিক অনুদান, লালচাঁদপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের একাংশ ভরাট সহ বিভিন্ন উন্নয়নে ৫ লাখ টাকা, হাজিপুরা মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য ২ লাখ টাকা, বড়কেশতলা বাজার মসজিদের উন্নয়নে ১ লাখ টাকা, বড়কেশতলা একটি নুরানী মাদ্রাসার জমি ক্রয় ও উন্নয়নের জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুদান প্রদানের পাশাপাশি লাকসাম-মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের শতাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নগদ অর্থ প্রদান করে সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন তিনি। এছাড়া নিজ এলাকার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসার্ত সাহায্যে তার অবদান রয়েছে।

২০১৭ সালে কুমিল্লার লাকসাম পৌরশহরের আল-আমিন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ফারজানা আক্তার সাফার দু’টি কিডনিই প্রায় বিকল হয়ে গিয়েছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ২১ লাখ টাকা। সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিয়ে সাফার কাতার প্রবাসী বাবার পক্ষে তা ছিল অসম্ভব বিষয়। সে সময় সাফার বাবা কাতারে বাংলাদেশী সাংবাদিকদের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তার মেয়েকে বাঁচাতে ধর্নাঢ্য ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ করেন। ৩/৪দিনের মধ্যে কুমিল্লার স্থানীয় সাপ্তাহিক ‘সময়ের দর্পণ’ পত্রিকায় ‘কাতার প্রবাসী লাকসামের অসহায় এক পিতার করুণ আকুতি; সাফাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওই স্কুলছাত্রীর চিকিৎসার পুরো ২১ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন সৌদি প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সুমন। ঘোষণার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তিনি সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে সাফার পরিবারের হাতে ২১ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। অনুদানের ওই টাকায় ভারতে নিয়ে সাফার শরীরে কিডনি সংযোজন করা হয়। বর্তমানে সাফা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।

সাফাকে অনুদান প্রদানের কয়েকদিন পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজে ‘দিনাজপুরের একটি অসহায় মেয়ের চিকিৎসায় মানবিক সাহায্যের’ একটি নিউজ ফেসবুকে শেয়ার হয়। নিউজটি নজরে পড়ার সাথে সাথেই প্রবাসী মিজানুর রহমান সুমন পোষ্টটিতে কমেন্টস করে লিখেন, ‘আমি অসুস্থ বোনটির চিকিৎসার পুরো টাকাটা দিতে চাই’। ঘোষণার ৩/৪দিনের মধ্যেই দিনাজপুরের অসহায় ওই মেয়ের পুরো চিকিৎসার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পৌঁছে দেন। শুধু সাফা আর দিনাজপুরের অসহায় ওই মেয়েটিই নয়, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এমন অসংখ্য দূরারোগ্য রোগীকে মিজানুর রহমান সুমন কোটি টাকারও বেশি দান করে ব্যাপক প্রশংসিত হন।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসায় অনবদ্য অবদানের পাশাপাশি প্রবাসী মিজানুর রহমান সুমন ২০১৭ সালে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে প্রায় কোটি টাকার ত্রাণ ও নগদ অনুদান বিতরণ করেন। শুধু দেশে নয় প্রবাসেও নিজ এলাকার বাসিন্দাদের পাশে রয়েছেন মিজানুর রহমান সুমন। সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে তার রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল। সেখানেও নিজ প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। মিজানুর রহমান সুমন সমস্যাগ্রস্ত প্রবাসীদের বিশ্বস্ত ঠিকানা। কেউ সমস্যায় পড়লে তিনি তাৎক্ষনিক এগিয়ে আসেন। মুহুর্তের মধ্যে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। কোন প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে অর্থনৈতিক কারণে বা অন্য কোন সমস্যায় মরদেহ দেশে আনতে সমস্যা হলে তিনি সহযোগিতা করে থাকেন। করোনাকালীন অর্থকষ্টে থাকা মানুষের মধ্যে খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ, পথশিশুদের সহযোগিতা, ঘর না থাকা মানুষদের ঘর নির্মাণ, রমজানে অসহায়দের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, এতিমখানায় খাবার বিতরণ, প্রতিবন্ধিদের পাশে দাঁড়ানোসহ অসংখ্য নজির রয়েছে মিজানুর রহমান সুমনের।

এ বিষয়ে কথা হলে সৌদি প্রবাসী মিজানুর রহমান সুমন বলেন, আল্লাহ রাবুল আলামিন আমাকে যতটুকু দিয়েছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট। আমি মনে করি আমার অর্জিত সম্পদে হতদরিদ্র মানুষের হক রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত আমি অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চাই। আমি চাই সমস্যাগ্রস্ত একটি মানুষও যেন আমার কাছ থেকে ফিরে না যান। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাতে আমার স্বপ্ন-আশা পূরণ করেন এ জন্য সকলের দোয়া প্রত্যাশী।